ওয়ান-ইলেভেনের মত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব মাইনাসের খেলা চলছে বিদেশ থেকে
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে একটি অগণতান্ত্রিক তৎপরতা রয়েছে- অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি বলেন, দলের নেতৃত্ব পরিবর্তনে ‘বিদেশ থেকে একটা খেলা চলছে’। তবে খেলা বলতে আসলে কী বোঝাচ্ছেন এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত সে বিষয়টি পরিষ্কার করেননি। দলের নেতৃত্বে শেখ হাসিনার পর পরিবারের কারো সরাসরি হাল ধরার সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন সজীব ওয়াজেদ। শেখ হাসিনার পর তিনি দলের নেতৃত্বে আসতে চান কি না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক দল। ভবিষ্যতে কে নেতৃত্ব দেবে, সেটা দল নির্ধারণ করবে। আমি বা অন্য কেউ এ ব্যাপারে নির্দেশ দিতে পারি না। যা এখন চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন কিন্তু বাস্তবে দলের নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে বিদেশ থেকে একটা খেলা চলছে। এটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। গত বছরের ৫ই আগস্টের পর আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে রাজনীতিতে বড় সংকটের মধ্যে পড়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের দায়িত্বশীল অধিকাংশ নেতাই দেশে-বিদেশে আত্মগোপনে আছেন, বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী কারাবন্দি। সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর রাজনীতিতে তাঁর ভবিষ্যত ও আওয়ামী লীগের পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে। ৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে নতুন নেতৃত্বে ‘রিফাইন্ড বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’কে রাজনীতিতে সক্রিয় করার বিষয় আলোচনায় আসে। যদিও রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ ধারণার বিপক্ষে কঠোর মনোভাব আছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুগত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে। রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ নিয়ে যে আলোচনা আছে, সেটা কীভাবে দেখেন- এ প্রশ্নে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, এই রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ হচ্ছে সেই ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের বিষয়টা। তখনো রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ আলেচনায় এসেছিল। দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে বড় দল উল্লেখ করে সজীব ওয়াজেদ বলেন, দুই দলেরই নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক আছে, যা দেশের বাকি কোনো দলের নাই। বাংলাদেশে ক্ষমতায় এলে বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগ এই দুই দলের একটি আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ বাস্তবতায় কাদের ইচ্ছায় রিফাইন্ড- প্রশ্ন তুলে সজীব ওয়াজেদ বলেন, “বিদেশি কয়েকটা দেশ, বিদেশি কয়েকটা শক্তি আর আমাদের সুশীল সমাজের কয়েকজন মিলে নির্ধারণ করতে চায়, কে প্রধানমন্ত্রী হলে রিফাইন্ড হবে, কে নেতা হলে রিফাইন্ড হবে।” বাংলাদেশের জনগণ এরকম কিছু চায় কি না এই প্রশ্ন তোলেন সজীব ওয়াজেদ জয়। রিফাইন্ড আওয়ামী লীগে নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “বাইরে থেকে ঠিক করে দিতে চায় আওয়ামী লীগকে ফিল্টার করে যোগ্য নেতৃত্ব। নেতা আমরা বেছে দেব। মানুষের ভোটে না, নেতাকর্মীদের ভোটেও না। সেটাই হচ্ছে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র। রিফাইন্ড আওয়ামী লীগে আমি বিশ্বাস করি না। আমার বিশ্বাস গণতন্ত্রে, দলই নির্ধারণ করবে যে দলের নেতৃত্ব কে দেবে, দেশের মানুষ নির্ধারণ করবে যে দেশের নেতৃত্ব কে দেবে।” বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই নেতৃত্ব পরিবর্তন চায় না দলের নেতাকর্মীরা। দেশের মধ্যে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিবেশ নেই বলে মন করছে আওয়ামী লীগ। এ বিষয়ে সজীব ওয়াজেদ বলেন, দলের নেতৃত্ব তো এখনো আছে, দলের সভাপতি আমার মা। উনাকে দলের নেতাকর্মীরাই সমর্থন করে রেখেছেন। কেউ উনাকে ছেড়ে যায়নি। তারা ঐক্যবদ্ধ আছে। দলের নেতৃত্ব অটুট, আমাদের দলও সম্পূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। নেতাকর্মীরা অধিকাংশই এলাকায় থাকতে পারছে না। মামলা, গ্রেপ্তার এবং মব আতঙ্কে দলের কোথাও কোনো তৎপরতা নেই। প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচি পালনেরও সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের হয়ে বিদেশে সজীব ওয়াজেদ জয় নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছেন। দলের নেতৃত্বে আসবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটাও তার নিজের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভবিষ্যতে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। তিনি বলেন, “আমি আসলে সরাসরি কোনোদিন রাজনীতি করতে চাইনি। বাট এখন যে খেলা চলছে তাতে কী হবে তাতো কেউ বলতে পারে না। তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ তার নিজের নির্ধারণ করতে হবে, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্ধারন করতে হবে।”Politics দলের বর্তমান পরিস্থিতি ও সংকট স্বীকার করে তিনি জানান, এই মুহূর্তে তার ইচ্ছা নেতৃত্ব দেওয়া নয়, বরং লক্ষ্য দেশে গণতন্ত্র ও শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করা। তার মতে, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হুমকির মুখে সেটি আগে রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে এই দেড় বছরে যে নির্যাতন চলেছে, স্বাধীনতার চেতনা মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। এখনো চলছে বাংলাদেশে এটা মোকাবিলা করা। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা বাংলাদেশের মানুষ নির্ধারণ করবে। দলে কী হবে এটা দলের নেতাকর্মী নির্ধারণ করবে। আমার এখন যেটা ইচ্ছা, যেটা দায়িত্ব স্বাধীনতার চেতনাকে আমার রক্ষা করতে হবে।” বাংলাদেশে এবং আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের সংকট কীভাবে পূরণ হবে সে বিষয়ে সজীব ওয়াজেদ বলেন, “নেতৃত্বের সংকট পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। আমাদের যত নেতা আছে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরে রাখা হয়েছে, এখন দেড় বছর ধরে তারা জেলে। বাকিরা জেলের ভয়ে, দেশ ছেড়ে থাকতে হয়েছে।” তিনি জানান, বাংলাদেশে এখনো আওয়ামী লীগের ওপর বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থন রয়েছে এবং তারা স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী। বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র বলেন, “এখন যে আপনি নেতৃত্বের কথা বলছেন, এখন তো আওয়ামী লীগকে ব্যান করে রাখা হয়েছে। আমরা কোনো কর্মসূচি করতে পারি না, কোনো মিটিং করতে পারি না, নির্বাচন তো দূরের কথা। আওয়ামী লীগ বিরাট একটা দল। আওয়ামী লীগকে দাবিয়ে রাখা যাবে না।” শেখ হাসিনার পর আওয়ামী লীগে নেতৃত্বে কে আসবেন, এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ স্পষ্ট করেনি। এখনো আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই ঐক্যবদ্ধ বলে বিশ্বাস নেতাকর্মীদের। সজীব ওয়াজেদ বলেন, “আওয়ামী লীগ একটা গণতান্ত্রিক দল। আমরা তো একটা রাজত্ব না যে আমরা নির্ধারণ করে দেবো কে নেতৃত্বে আসবে কে আসবে না। আওয়ামী লীগই একমাত্র দল- যে কখনো বলেনি শেখ হাসিনার পর কে আসবে।” “এটাই আওয়ামী লীগের সবথেকে বড় শক্তি। উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কিছু আমরা মানি না। আমরা নেতাকর্মীদের উপর ভরসা করি, দলীয় গণতন্ত্রের উপর ভরসা করি। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা কেউ জানে না কে আসবে, কে নেতা হতে চাইবে। সেটা আমাদের দলের যখন কাউন্সিল হয় সেখানেই কিন্তু দলের নেতৃত্ব নির্বাচন হয়। আমরা নিজেদের দলের ভেতর নির্বাচন করি ব্যালট দিয়ে, সেখান থেকেই আমার মাকে দল প্রত্যেকবার সভাপিত নির্বাচিত করেছে,” বলেন তিনি। অতীতে শেখ হাসিনা তাকে নেতৃত্ব গ্রহণের বিষয়ে বিবেচনা করতে বলেছেন বলে জানান সজীব ওয়াজেদ। তার ভাষায়, দলে কেউ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় না। তিনি বলেন, “সবাই উনাকেই (শেখ হাসিনা) চায়। হ্যাঁ, অনেকেই আমাকে বলেছেন বার বার আসতে, আমার মাও আমাকে অনেকবার বলেছেন গত পাঁচ-দশ বছরে। তবে আমরা সবাই চাই যে সময়মতো সেটা দল বেছে নেবে। দল যাকে চাবে, সে দাঁড়াবে। দলের ভেতরে নির্বাচন হবে, যে বেশি ভোট পাবে সে দলের সভাপতি হবে। সেটাই আমরা চাই।” আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রসঙ্গে সাম্প্রতিককালে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামটিও আলোচনায় আছে তৃণমূলে। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্য হিসেবে শেখ রেহানা এবং তাঁর ছেলে-মেয়েরাও রাজনীতিতে সক্রিয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও চান ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে মুজিব পরিবারের মধ্যেই থাকুক। শেখ পরিবারের সদস্যদের নেতৃত্বে আসার প্রসঙ্গে সজীব ওয়াজেদ বলেন, “আমাদের পরিবারের অনেকেই বিদেশে স্টাবলিশড। আমরা সবাই পড়ালেখা করেছি। আমার পরিবারের পাঁচ ভাই-বোন আমাদের সবার মিনিমাম মাস্টার্স আছে, বিদেশে আয় আছে। রাজনীতি করতে হলে রাজনীতির ইচ্ছা থাকতে হয়। আমাদের পরিবারের টিউলিপের রাজনীতি করার ইচ্ছা ছিল সে রাজনীতি করেছে ইংল্যান্ডে, ব্রিটেনে। বাংলাদেশে করেনি কখনো।” সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা কতটা এ প্রশ্নে সজীব ওয়াজেদ বলেন, এ নিয়ে আলোচনা আছে, তবে বাস্তবতা ভিন্ন। আমার বোনকে নিয়ে যে চিন্তা করা হয়। আমার বোনের আসলে রাজনীতিতে সেরকম কোনো ইচ্ছা নেই, আমি যতদূর জানি। এটা অনেকেই ভাবছে তবে এই ধারণাটা ভুল। ৫ই আগস্টের পর পরিবারের মধ্য থেকে দলীয় নেতৃত্বের বিষয়টি নিজেদের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে বলেও উল্লেখ জানান সজীব ওয়াজেদ। তার মতে, পরিবারের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ বলেই সবাইকে মামলা দিয়ে সাজা দেওয়া হচ্ছে যাতে নির্বাচনে অযোগ্য করা যায়। তিনি বলেন, “তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করছে যেন আমাদেরকে কনভিক্ট করতে পারে, যেন আমরা নির্বাচন করতে না পারি। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- আমরা কেউ যেন নির্বাচন করতে না পারি।” প্রসঙ্গত, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি প্লট বরাদ্দ নেওয়ার কথিত অভিযোগে করা মামলায় শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড এবং পুতুল ও জয়কে ৫ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত। বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আসন্ন নির্বাচনে একটা বড় সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে যে আওয়ামী লীগকে বাইরে রাখার।Demographics নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অবস্থান কী- এ প্রশ্নে সজীব ওয়াজেদ বলেন, এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা এইরকম সাজানো নির্বাচন, দেশের অর্ধেক ভোটারদের বাদ দিয়ে- আমরা হতে দেবো না। আমরা আন্দোলন করবো। আমাদের জন্য তারা কোনো পথ খোলা রাখেনি। আপনি যখন কাউকে সবদিক থেকে বেঁধে দেবেন তখনতো তার আন্দোলন ছাড়া কোনো পথ থাকে না। জুলাই দাঙ্গার হতাহতের বিষয়ে সমালোচনা হয় যে এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অনুশোচনা নেই। জুলাই দাঙ্গা নিয়ে আওয়ামী লীগ কি জাতির কাছে ক্ষমা চাইবে? এ প্রশ্নে সজীব ওয়াজেদ বলেন, ক্ষমা চাইলেই কি তারা সবকিছু ছেড়ে দেবে? জুলাইয়ে যদি আওয়ামী লীগ সরকারের সত্যি কোনো দায় থাকে, তবে তার স্পষ্ট তদন্ত করতে হবে। তিনি বলেন, “আমার মা তখন প্রধানমন্ত্রী, তিনি একটা জুডিশিয়াল কমিশন করেছিলেন সব হত্যার তদন্ত করতে। কারণ হত্যা তো শুধু ছাত্র-জনতার হয়নি, পুলিশের হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে। সেটারতো স্পষ্ট একটা তদন্ত করতে হবে যে সেটার জন্য কে দায়ী।” সজীব ওয়াজেদ বলেন, “যদি বিচার করতে হয়, ৫ই আগস্ট থেকে ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত যত হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তারও বিচার করতে হবে। কিন্তু সে জন্যে তো ইউনূস সরকার ইনডেমনিটি দিয়েছে। আপনি একদিকে বলছেন আওয়ামী লীগকে ক্ষমা চাইতে, অন্যদিকে পুলিশ আর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যাকারীদের মাফ করে দিচ্ছেন, তা কীভাবে হয়। যদি তাই হয়, তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমা চাওয়ার কী আছে?”
