চিফ প্রসিকিউটরের হুমকি: ন্যায়বিচারের সামনে ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা

২৯ নভেম্বর, ২০২৫ | ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , ডোনেট বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর একটি স্বাভাবিক শুনানির দিন। কিন্তু সেই দিন আদালতে ঘটে এমন একটি ঘটনা, যা ট্রাইব্যুনাল ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম প্রকাশ্য আদালতে প্রতিরক্ষা আইনজীবী নাজনীন নাহারকে ধমকান এবং হুমকি দেন। তিনি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঘটনার শুরু হয় যখন নাজনীন নাহার আদালতকে জানান—তাকে তার মক্কেলের জিজ্ঞাসাবাদে উপস্থিত হতে দেওয়া হয়নি। আইন বলছে—গ্রেপ্তারের পর থেকেই অভিযুক্ত ব্যক্তি তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার অধিকার রাখে। কিন্তু আইনি উদ্বেগের বিষয়ে উত্তর না দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর তাঁকে চুপ থাকতে বলেন এবং হুমকি দেন যে, চাইলে তাকেও মামলার আসামি করা হতে পারে। এ দৃশ্য আদালতে উপস্থিত আইনজীবী, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করে। দেশের বিচার ইতিহাসে একজন রাষ্ট্রীয় প্রসিকিউটরের এমন প্রকাশ্য হুমকির নজির আর নেই। উল্লেখ্য, একই তাজুল ইসলাম একসময় যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন—তখন তাঁকে কখনোই আসামি করার হুমকি দেওয়া হয়নি। গভীর আইনি সংকট ও অধিকারহরণের প্রশ্ন বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে—কোনো আইনজীবীকে ভয় দেখানো, হয়রানি বা হুমকি দেওয়া যাবে না, শুধুমাত্র তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন বলেই। আদালতে অভিযোগ তোলা বা আবেদন দাখিল করা আইনজীবীর পেশাগত দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে অপরাধী ভাবা বেআইনি। নাহারের আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত হতে না পারা নিজেই সংবিধান লঙ্ঘন। সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে সবারই অধিকার আছে নিজের পছন্দের আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার—গ্রেফতারের মুহূর্ত থেকেই। অথচ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বারবার সমালোচনা করা হয়েছে প্রতিরক্ষা পক্ষকে তথ্য-প্রমাণে প্রবেশাধিকার না দেওয়া, জিজ্ঞাসাবাদের সময় উপস্থিত থাকতে না দেওয়া এবং তাঁদের ভূমিকা সীমিত করে রাখার জন্য। এবার প্রকাশ্য আদালতে হুমকি সেই উদ্বেগ আরও গভীর করেছে। ভয়ভীতি দেখানোর ফলে ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি ন্যায়পূর্ণ বিচার ব্যবস্থায় উভয় পক্ষের সমান সুযোগ থাকা জরুরি। যদি আইনজীবীরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিশোধের আশঙ্কা করেন—তাহলে ন্যায়বিচারের ভিত্তি ভেঙে পড়ে। প্রসিকিউটর যদি প্রতিরক্ষা আইনজীবীকেই অভিযুক্ত করার হুমকি দেন—তাহলে বিচারব্যবস্থার ভারসাম্য কোথায় থাকে? এ অভিযোগ ট্রাইব্যুনালের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৭১ সালের গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত প্রতিষ্ঠানটি এখন নিজেই বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়ছে। বাংলাদেশের আইন ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট বাংলাদেশে অভিযুক্ত ব্যক্তির যে অধিকার রয়েছে— একইসঙ্গে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির স্বাক্ষরকারী। সে হিসেবে আইনজীবীর স্বাধীনতা, অভিযোগ প্রতিহত করার অধিকার, ন্যায্য বিচার—সবই রক্ষা করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। ২৩ নভেম্বরের ঘটনা সেই প্রতিশ্রুতির সরাসরি লঙ্ঘন। বিচারব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ ইঙ্গিত আদালতের সামনে, বিচারকদের উপস্থিতিতে যদি প্রতিরক্ষা আইনজীবীকেও নিরাপত্তাহীন মনে হয়—তবে অভিযুক্তের অধিকার রক্ষা কিভাবে হবে? আইন যদি শক্তির চাপে দুর্বল হয়ে পড়ে—তাহলে ন্যায়বিচার কেবল মুখের কথা হয়ে যায়। বাংলাদেশ প্রায়ই আইনের শাসন ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বাস্তবতা যদি ভিন্ন বার্তা দেয়—জনমনে আস্থা টিকবে কীভাবে? আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে— তারা কি ন্যায়বিচারের মান রক্ষা করবে? নাকি ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে? ন্যায়বিচার তখনই টিকে থাকে, যখন প্রতিরক্ষা অধিকারকে সম্মান করা হয়। ভয়ভীতি দিয়ে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হলে বিচার নয়—ক্ষমতার অপব্যবহারই প্রতিষ্ঠা পায়। পারভেজ হাসেম লেখক পরিচিতি: আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মী