অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর বদলে গভীর খাদের কিনারে: প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে, খেলাপি ঋণে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ । ড.মামুনুর রশিদ

২৯ নভেম্বর, ২০২৫ | ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , ডোনেট বাংলাদেশ

সরকারি ভাষ্যমতে গত ১৫ বছরের তুলনায় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলা হলেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো বলে দাবি করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. মামুনুর রশীদ। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দেউলিয়া দেশগুলোকে ছাড়িয়ে খেলাপি ঋণের হারে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে শীর্ষে। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং ড. মামুনুর রশীদের বিশ্লেষণ থেকে অর্থনীতির এই নাজুক চিত্র উঠে এসেছে। জিডিপি ও প্রবৃদ্ধিতে বড় ধসের শঙ্কা চলতি অর্থবছরে (২০২৪-২৫) জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৩৫ শতাংশ। তবে বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকলে এটি ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ড. রশীদ। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই ধারা চলতে থাকলে ২০২৬-২৭ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ‘সম্ভাবনাময় জিডিপি’ হারাবে।” খেলাপি ঋণে বিশ্বরেকর্ড: পেছনে পড়ল শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানও বণিক বার্তার এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ। যেখানে শ্রীলঙ্কার খেলাপি ঋণের হার ১২.৬%, পাকিস্তানের ৯.৪% এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের ২৯.১%, সেখানে বাংলাদেশের হার তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। ড. মামুনুর রশীদ অভিযোগ করেন, গত এক বছরে খেলাপি ঋণ ৭-৮ গুণ বেড়েছে। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং খাতে এই অরাজকতা ইচ্ছাকৃত। রাজনৈতিক কারণে বিরোধী মতের উদ্যোক্তাদের বাজার ছাড়া করা এবং তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করার সংস্কৃতি বেসরকারি খাতকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বর্তমানে ২৪টি ব্যাংক অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।” রাজস্ব ঘাটতি ও আইএমএফ-এর চাপে করের বোঝা কালবেলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এনবিআর সংশোধনের নামে বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও গত চার মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আইএমএফ-এর চাপে জনগণের কাঁধে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বাড়তি করের বোঝা চাপানো হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, তারা চিৎকার করলেও সরকার তা শুনছে না। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ মন্তব্য করেছেন, “দেশের অর্থনীতির রক্তক্ষরণ হচ্ছে, কিন্তু নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতায় পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।” রপ্তানি বাণিজ্যে ধস ও বন্দরের অস্থিরতা গত তিন মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বিদেশি বড় ক্রেতাদের সঙ্গে প্রায় ২০০টি বৈঠক বাতিল হয়েছে। ড. মামুনুর রশীদ জানান, ব্যাংক ঋণের খরচ বৃদ্ধি এবং বন্দর নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পে ধস নেমেছে। অন্যদিকে, আমদানিতেও স্থবিরতা চলছে। চাল আমদানি করতে হচ্ছে তৃতীয় দেশ (দুবাই, সিঙ্গাপুর) হয়ে, যা খাদ্যনিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি করছে। কৃষকের পিঠ দেয়ালে: সারের দামে আগুন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার কারখানায় গ্যাসের দাম এক লাফে ৮৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে সারের দাম বেড়েছে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। ড. রশীদ বলেন, “বন্যা ও হিমাগারের অভাবে কৃষক পানির দরে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। সার ও বীজের অভাবে কৃষি খাত এখন চরম বিপর্যয়ে।” শেয়ারবাজার ও মুদ্রাবিনিময় হারের অস্থিরতা গত এক বছরে শেয়ারবাজারের মূলধন ৫০ শতাংশ উধাও হয়েছে এবং প্রায় ৮০ হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন। রেমিট্যান্স বাড়ার কথা বলা হলেও ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে (জুন ২০২৫ পরবর্তী চার্টে দৃশ্যমান) এর প্রকৃত সুফল মিলছে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ড. মামুনুর রশীদ জানান, বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে বর্তমানে দেশের ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ, দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখন দরিদ্র। অর্থনীতিবিদদের মতে, এখনই কার্যকর সংস্কার না করা হলে সামনের দিনগুলোতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।