ইন্দোনেশিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্রতর, অনিশ্চয়তায় প্রাবোও প্রশাসন

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিভিন্ন ইস্যুর বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী সহিংস বিক্ষোভ ইন্দোনেশিয়ায় আলোড়ন তুলেছে। রাজধানী জাকার্তায় বিক্ষোভের সময় পুলিশের গাড়িচাপায় একজন তরুণ ডেলিভারি রাইডারের মৃত্যুর পর ক্ষোভের আগুন আরও তীব্রভাবে জ্বলে উঠেছে। শুক্রবার (২৯ আগস্ট) এক রেকর্ড করা ভিডিও ভাষণে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং সরকার ও তার নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে বলেন। তবুও বিক্ষোভকারীরা পুলিশ ব্রিগেডের সদর দপ্তরে আগুন লাগায়। মধ্য জাকার্তার কুইতাং পাড়ায় পুলিশ কম্পাউন্ডের কাছে একটি পাঁচ তলা ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গতকাল ভারী বৃষ্টিপাত সত্ত্বেও সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। এটি অক্টোবরে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এরই মাঝে আজ শনিবার একটি আঞ্চলিক পার্লামেন্টে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে ৩ জন সরকারি কর্মচারি প্রাণ হারিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ কী? সহিংসতাগুলো মাসের পর মাস অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হতাশার চূড়ান্ত পরিণতি। ৫৮০ জন সংসদ সদস্য তাদের বেতনের পাশাপাশি মাসিক ৫ কোটি রুপিয়াহ (৩০০০ ডলার) আবাসন ভাতা পান বলে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এই বিক্ষোভ শুরু হতে থাকে। গত বছর চালু হওয়া এই ভাতা জাকার্তার ন্যূনতম মজুরির প্রায় ১০ গুণ এবং দেশের দরিদ্র অঞ্চলে মাসিক ন্যূনতম মজুরির প্রায় ২০ গুণ বেশি। ২৮ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশটিতে পুলিশ এবং পার্লামেন্ট মেম্বারদের প্রায়শই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। বিক্ষোভের সংগঠকদের একটি অংশের সদস্য গেজায়ান মেমাঙ্গিল বলেন, বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট মেম্বারদের বেতন কমানোর দাবি জানাচ্ছেন। এদের তিনি 'দুর্নীতিবাজ অভিজাত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীরা দাবি করছেন, কর এবং মুদ্রাস্ফীতি অনেকের জীবনযাত্রাকে অসম্ভব করে তুলছে। তাদের চাওয়া, মুদ্রাস্ফীতির হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করা হোক। প্রাক্তন সামরিক জেনারেল প্রাবোও পাঁচ বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা তার প্রতিশ্রুতিকে অতি উচ্চাভিলাষী বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ এই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার পণ্যে ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও ওয়াশিংটন নীতিগতভাবে পাম তেল, কোকো এবং রাবারকে এই শুল্ক থেকে অব্যাহতি দিতে সম্মত হয়েছে। চীনের পর যুক্তরাষ্ট্রই ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। বিশ্বব্যাংক অনুমান করেছে, ২০২৫ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি গড়ে ৪.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। এই সংখ্যা প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর প্রতিশ্রুত স্তরের চেয়ে অনেক কম। কী চলছে? ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মাঝে সোমবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু হয়। কালো পোশাক পরা শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীরা গেট ভেঙে ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্ট ভবনের প্রবেশের চেষ্টা করে। দাঙ্গা পুলিশকে লক্ষ্য করে তারা পাথর ছুড়ে মারে এবং আতশবাজি ফোটায়। পরের দিনগুলোতে জনসাধারণের সম্প্রিক্ততায় দেশব্যাপী এই অস্থিরতা অব্যাহত ছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ব্যাপক ভাইরাল হয়, যা ক্ষোভে আগুন ঢেলে দেয়। ভিডিওতে দেখা যায়, মোটরসাইকেলে করে ২১ বছর বয়সী আফান কুর্নিয়াওয়ান নামের এক তরুণ বিক্ষোভের ভিড়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। খাদ্য সরবরাহের জন্য যাওয়ার পথে পুলিশের সাঁজোয়া গাড়ি ভিড়ের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে তাকে চাপা দেয়। এরপর জনতা গাড়িটিকে ধাওয়া করলে দ্বিতীয়বারের মতো আফানকে চাপা দেয় গাড়িটি। এরপর দাঙ্গা পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ভিডিওটি জাতিকে হতবাক করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে আরও উস্কে দেয়। শুক্রবার বিক্ষোভকারীরা জাকার্তায় পুলিশ ব্রিগেডের সদর দপ্তরে মিছিল করে। কেউ কেউ রাস্তায় ট্র্যাফিক সাইন এবং অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করে। এর ফলে এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সংঘর্ষ চলতে থাকে এবং দ্রুত জাকার্তা ও এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়লেও বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হতে অস্বীকৃতি জানায়। ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরাবায়ায় বিক্ষোভকারীরা গভর্নরের অফিস প্রাঙ্গণে হামলা চালায়। বেড়া ভেঙে ফেলে এবং যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং জলকামান ব্যবহার করে। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা আতশবাজি ও কাঠের লাঠি দিয়ে পাল্টা আক্রমণ করে। পাপুয়া অঞ্চলের পূর্ব দিকের সুরাবায়া, সোলো, যোগকার্তা, মেদান, মাকাসার, মানাডো, বান্দুং এবং মানোকোয়ারিসহ সারা দেশের অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ হয়েছে। সর্বশেষ খবর কী? ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা শনিবার জানিয়েছে, জাকার্তা থেকে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার পূর্বে মাকাসারের একটি আঞ্চলিক পার্লামেন্ট ভবনে আগুন লেগে তিন জন নিহত হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আগুনে নিহতদের পাশাপাশি পাঁচ জন আহতও হয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থা আন্তারা জানিয়েছে, আগুন থেকে বাঁচতে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ার সময় দু'জন আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাকার্তায় অবস্থিত সিঙ্গাপুর দূতাবাস তাদের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্রটির নাগরিকদের বিক্ষোভ এবং বৃহৎ জনসমাবেশ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এরপর কী হতে পারে? ইন্দোনেশিয়ার জেনারেল থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া প্রাবোও তরুণ রাইডারের মৃত্যুর 'পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত' করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রাবোও শুক্রবার জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে বলেন, 'অফিসারদের অতিরিক্ত কর্মকাণ্ডে আমি হতবাক এবং হতাশ।' এরই মধ্যে শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারের দাম ১.৫ শতাংশ কমে যায়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির দামও ০.৮ শতাংশ কমে গেছে। এতকিছুর মাঝে প্রাবোও প্রশাসনের জন্য এই বিক্ষোভ একটি পরীক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রাবোও জনগণকে শান্ত করার চেষ্টা করার সময় অর্থনৈতিক মন্দা আগুনে আরও ঘি ঢালতে পারে বলে মনা করা হচ্ছে। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রাবোও 'গণতান্ত্রিকভাবে কাজ করার' প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সতর্ক করে দিয়েছিলেন, প্রয়োজনে তিনি 'সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ' নিতে পিছপা হবেন না। সমালোচক এবং বিরোধী নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, প্রাক্তন জেনারেল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্বৈরাচারী উপায় অবলম্বন করতে পারেন। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা