দারিদ্র্য নিয়ে পিপিআরসির তথ্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা

অর্থনীতিবিদ ড. মামুনুর রশিদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে অর্জিত সাফল্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে ভেঙে পড়েছে। তার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে কাটছাঁট, কৃষি খাতের সংকট এবং জ্বালানি ঘাটতি মিলিয়ে দেশে চরম দারিদ্র্যের হার এক বছরে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ের সাফল্য ড. মামুনুর রশিদ তার গবেষণায় উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ২২ ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু করেছিল। এসব প্রকল্প আয়-ব্যয়ের নিচের দিকে থাকা ১০% মানুষকে স্বনির্ভর হতে সহায়তা করেছিল। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, চরম দারিদ্র্যের হার কমতে থাকে এবং ক্ষুদ্র অপরাধও নিয়ন্ত্রণে ছিল। ড. ইউনূসের সময়ে প্রকল্পের ওপর খড়গ গবেষণায় বলা হয়েছে, ড. ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম যে খাতে আঘাত করা হয়, তা হলো সামাজিক সুরক্ষা। এই প্রকল্পগুলো সংকুচিত করা হয়। পাশাপাশি কৃষিখাতে দেখা দেয় সার ও বীজের সংকট, জ্বালানি ঘাটতির কারণে সেচ প্রকল্পও বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলেই কৃষি উৎপাদন কমে যায়, আয় হ্রাস পায় এবং চরম দারিদ্র্য দ্রুত বাড়তে শুরু করে। পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর এক সমীক্ষা চালিয়ে দাবি করেছে, ২০২২ সালে চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৫.৬%, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩৫%। কিন্তু ড. মামুনুর রশিদ এ তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার ভাষ্য, “পিপিআরসি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ২০২২ সালের তথ্যকে বেছে নিয়েছে, যাতে গত এক বছরের ভয়াবহ দারিদ্র্য বৃদ্ধির চিত্র আড়াল করা যায়।” বিশ্বব্যাংকের তথ্য ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০১৬ সালে চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ১০%। সাত বছরে (২০১৬-২০২২) তা নেমে আসে ৫.৬%-এ। ২০২৩ সালে এই হার ছিল ৪.৯% এবং ২০২৪ সালে ৫.১%। অথচ পিপিআরসি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে হার দাঁড়িয়েছে ৯.৩৫%-এ। এর মানে দাঁড়ায় মাত্র এক বছরে (২০২৪-২০২৫) চরম দারিদ্র্যের হার বেড়েছে ৪.৩%। অথচ পিপিআরসির প্রতিবেদনে তিন বছরের গড় পার্থক্য দেখিয়ে দায় আংশিকভাবে শেখ হাসিনার সরকারের ঘাড়েও চাপানো হয়েছে। সমীক্ষার অন্যান্য তথ্য ড. মামুনুর রশিদের ভাষ্যে, পিপিআরসির প্রতিবেদনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে— দেশে বর্তমানে ৯৮.৪% পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, অথচ এটা শেখ হাসিনার সময়ের সাফল্য। শহরে গড় আয় গত কয়েক বছরে ৫ হাজার টাকার বেশি কমেছে। আয়ের দিক থেকে নিচের ৪০% পরিবারের মাসিক গড় আয় ১৪,৮৮১ টাকা, অথচ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৭,৩৮৭ টাকা। ফলে মাসে গড়ে ২,৫০৬ টাকা ঋণ বা সঞ্চয় থেকে মেটাতে হচ্ছে। খাদ্যে ব্যয় হচ্ছে মোট খরচের ৫৫%, অথচ কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ঋণের পরিমাণ বেড়েছে; নিচের ১০% পরিবারের ঋণ-জমার অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২১৮%। সবচেয়ে দরিদ্র ১০% পরিবারের মধ্যে ৯% পরিবার দিনে কোনো খাবারই পায়নি। অতি ঝুঁকিপূর্ণ দারিদ্র্য ২০২২ সালের ১৩.১% থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১৮.৫৮%। বর্তমানে মোট দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮%—অর্থাৎ প্রতি তিনজনে একজন দরিদ্রসীমার নিচে বাস করছে। ড. মামুনুর রশিদের বক্তব্য ড. মামুনুর রশিদ বলেন, “যেখানে ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সাত বছরে চরম দারিদ্র্য মাত্র ৪.৪% কমেছে, সেখানে ইউনূস সরকারের নীতিগত ব্যর্থতায় এক বছরেই ৪.৩% বেড়ে যাওয়া একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। এই ব্যর্থতা আড়াল করতেই পিপিআরসি তিন বছরের পুরনো তথ্য ব্যবহার করেছে।” তিনি আরও বলেন, “যদি সত্য প্রকাশিত হয় যে শেখ হাসিনার আট বছরের অর্জন ইউনূসের হাতে ধূলিসাৎ হয়েছে, তাহলে তা তাঁর জন্য বিব্রতকর হবে। তাই সমীক্ষার তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে।”