আবু সাঈদ হত্যা মামলায় বাবার জবানবন্দি: ঘটনার একদিন পরে দাফন ও গোসলের সময় মাথার পেছন থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো

২৯ আগস্ট, ২০২৫ | ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , ডোনেট বাংলাদেশ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন তাঁর বাবা মকবুল হোসেন। বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) আদালতে তিনি জানান, আবু সাঈদের মরদেহ বাড়িতে আনার পর গোসল করানোর সময় মাথার পেছনে থেকে রক্ত ঝরতে দেখা গেছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং পোস্টমর্টেম রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণে দাবি করা হচ্ছে, মাথার পেছনে ঢিল জাতীয় বস্তুর আঘাতে সৃষ্ট অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই আবু সাঈদের মৃত্যুর প্রধান কারণ। মকবুল হোসেন তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, “গত বছরের ১৬ জুলাই দুপুরে বাড়িতে এসে শুনি, আবু সাঈদের গুলি লেগেছে। জোহরের আগে জানতে পারি, সে মারা গেছে।” এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তিনি আরও বলেন, “আমার দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জামাই বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে লাশ খুঁজে পায়নি। পোস্টমর্টেমের জন্য লাশ নেওয়া হয়েছিল। রাত সাড়ে ৩টায় লাশ বাড়িতে আনা হয়। প্রশাসন রাতেই দাফনের জন্য চাপ দিলেও আমি রাজি হইনি। পরদিন সকাল ৯টায় দুইবার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।” তিনি উল্লেখ করেন, “লাশ গোসল করানোর সময় দেখি, মাথার পেছনে রক্ত ঝরছে। বুকে গুলির চিহ্ন ছিল। পরে শুনেছি, পুলিশ সদস্য আমির আলী ও সুজন চন্দ্র দাস আমার ছেলেকে গুলি করেছে।” তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও এবং পোস্টমর্টেম রিপোর্টের তথ্যে দেখা যায়, আবু সাঈদ পুলিশের সামনে দাঁড়ানোর সময় তাঁর ঘাড় রক্তে ভিজে ছিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মাথার পেছনে ১-২ ইঞ্চি ক্ষত থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণের কথা উল্লেখ রয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার আগে কিছু একটা আবু সাঈদের মাথার পেছনে আঘাত করে, এবং তিনি চমকে উঠে মাথায় হাত দেন। তাঁর সহপাঠীরা মাথার পেছন পরীক্ষা করলেও তাকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়নি। মাথার পেছনে লাগা ঢিলের আঘাতে রক্তাক্ত হবার পর পরই যদি সহপাঠিরা আবু সাঈদকে প্রথমিক চিকিৎসা দিতে নিয়ে যেতো, তাহলে আর আবু সাঈদের মৃত্যু হয় না। বলা যেতে পারে আবু সাঈদের সাথীদের অবহেলার কারনেই তার মৃত্যু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আবু সাঈদের শরীরে পাওয়া ছররা গুলির অবশিষ্টাংশ সত্ত্বেও তাঁর শরীরের উন্মুক্ত অংশ বা গেঞ্জি রক্তে ভিজে যায়নি, যা ইঙ্গিত করে যে ছররা গুলি তাঁকে রক্তাক্ত করেনি। বরং মাথার পেছনে ঢিল জাতীয় বস্তুর আঘাতে সৃষ্ট ক্ষত থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই তাঁর মৃত্যুর কারণ। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, অনেক ছাত্র ও জনতা শরীরে ছররা গুলির স্প্লিন্টার নিয়েও বেঁচে আছেন, যেমন হান্নান মাসুদ ২০০টি স্প্লিন্টার নিয়ে সুস্থ আছেন। কিন্তু আবু সাঈদের ক্ষেত্রে মাথার পেছনের আঘাতই মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে প্রমাণিত হয়েছে। আদালতে মকবুল হোসেনের জবানবন্দি এই তথ্যকে আরও নিশ্চিত করেছে। তিনি বলেন, “একদিন পরেও মৃতদেহ পরিষ্কারের সময় মাথার পেছনের ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছিল।” এই ঘটনা জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের সহিংসতার পাশাপাশি বিক্ষোভের অরাজক পরিস্থিতির একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। আদালতের পরবর্তী শুনানিতে এই মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।