‘কুমির কীভাবে বাংলাদেশি, ভারতীয়কে আলাদা করবে?’

১ মে, ২০২৬ | ৬:৫০ অপরাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , ডোনেট বাংলাদেশ

সীমান্তের নদীবেষ্টিত এলাকাগুলো দিয়ে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে এক বিতর্কিত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার যেখানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে কুমির ও বিষধর সাপের মতো হিংস্র প্রাণী ছেড়ে দেওয়া হবে। যেটিকে ‘প্রাকৃতিক বাধা’ তৈরির পদক্ষেপ বলা হচ্ছে। শরণার্থী ও অভিবাসীদের ঠেকাতে ভারত সরকারের এমন পরিকল্পনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষক ও অধিকার কর্মীরা। উত্তর-পূর্ব এবং পূর্ব ভারতের সীমান্ত রাজ্যগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন অংশুমান চৌধুরী। তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ধরা যাক, বিষধর সাপ বা কুমির ছেড়ে দেওয়া হলো। কিন্তু কে বাংলাদেশি আর কে ভারতীয়- সে পার্থক্য এই প্রাণীগুলো কীভাবে করবে? অংশুমান চৌধুরীর মতে, নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এটি চরম নিষ্ঠুরতা। এটি মূলত মানুষের বিরুদ্ধে প্রকৃতি ও প্রাণীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার একটি নতুন পদ্ধতি। যেটিকে ‘বায়োপলিটিক্যাল’ সহিংসতা বলা যেতে পারে। আলজাজিরাকে অংশুমান চৌধুরী বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দুর্বল জায়গা হলো নদী। মূলত নদীপথে স্থায়ী বেড়া দেওয়া প্রায় অসম্ভব। বিএসএফ-এর এই পুরনো উপলব্ধি থেকেই এমন পরিকল্পনা সামনে এসেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের কিছু অংশ অত্যন্ত দুর্গম এলাকায়। নয়াদিল্লির দাবি, এই দীর্ঘ সীমান্তের বেশ কিছু এলাকায় স্থায়ী বেড়া নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব। গত ২৬ মার্চ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ফ্রন্টের সদর দপ্তরগুলোকে একটি নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়েছে, সীমান্তের যেসব নদীপথ বেড়াহীন, সেখানে ‘সরীসৃপ মোতায়েনের সম্ভাব্যতা’ যাচাই করতে হবে। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে সীমান্তের দুই পাশের স্থানীয় বাসিন্দারা চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। নদী ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা আছে। এছাড়া কৃত্রিমভাবে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বড় শিকারি প্রাণী ছেড়ে দিলে তাতে বাস্তুসংস্থান ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ারও ঝুঁকি আছে। ‘কুমিরের মুখে ঠেলে দেওয়ার মানে নেই’ ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার কৌশল ও লিয়াজোঁ প্রধান রথীন বর্মন আলজাজিরাকে বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোতে কুমির বাস করে না। এই প্রাণীগুলোকে যদি সীমান্তে নিয়ে আসা হয়, তবে সেগুলো টিকে থাকতে পারবে না। রথীন বর্মন বলেন, ‘প্রথমত, এই প্রাণীগুলো দ্রুত মারা যাবে। তথাকথিত বিষধর সাপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।’ সীমান্তের জলাভূমিগুলো প্রায়ই প্লাবিত হয়। ফলে এসব বিষধর সাপ লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ারও শঙ্কা আছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, বিশেষ করে যারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা প্রাণের ঝুঁকিতে পড়বেন। ভারতের মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মান্দার বলছেন, এ ধরণের নীতি ভারতীয় রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতাকেই প্রতিফলিত করে। নদীতে থাকা একজন অভিবাসীকে কুমির, সাপ বা বন্দুকের মুখে ঠেলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। পরিকল্পনার নেপথ্যে কী? ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলো পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্যের পাশ দিয়ে গেছে। নয়াদিল্লি ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। বাকি অংশগুলো মূলত জলাভূমি ও নদীবেষ্টিত এলাকা। সেখানে সীমান্তের উভয় পাশে জনবসতি আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, নথিপত্রহীন অভিবাসীরা ভারতের জন্য এক বড় হুমকি। তাদের দাবি, এই অভিবাসীদের কারণে ভারতের জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে যাচ্ছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, মোদি সরকার এই বয়ানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে দেশটির পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাঙালি মুসলমানদের হয়রানি করছে। বিভিন্ন সময়ে বিএসএফ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বন্দুকের মুখে ভারতীয় মুসলমানদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার খবর প্রকাশ পেয়েছে। ভারতে বর্তমানে নথিপত্রহীন অভিবাসীর সংখ্যা কত, সেটির আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই। মানবাধিকার কর্মী হর্ষ মান্দার বলছেন, নথিপত্রহীন অভিবাসীর সংখ্যা যদি বেড়েও থাকে, তবে ভারতের উচিত ছিল বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের হস্তান্তর করা। কিন্তু ভারত এখন তাদের মোকাবিলায় ‘বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি’ বেছে নিয়েছে। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ভারত সরকার সাধারণ সংখ্যালঘুদেরকে (বিশেষ করে মুসলিমদের) অভিবাসীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে; তাদের ওপর অন্যায় আচরণ করার অজুহাত হিসেবে এই নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশ্বের কোথাও নজির আছে? আন্তর্জাতিক সীমানা পাহারা দেওয়ার জন্য প্রাকৃতিক শিকারি প্রাণী মোতায়েন করার কোনো আধুনিক নজির বিশ্বে নেই। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এ জাতীয় ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। তখন বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প সীমান্তে সাপ বা অ্যালিগেটর (কুমির সদৃশ প্রাণী) ভর্তি পরিখা খননের মতো পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছিলেন। তবে ট্রাম্প এসব প্রতিবেদন অস্বীকার করে বিষয়টিকে ‘ভুয়া খবর’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘আমি সীমান্ত সুরক্ষার বিষয়ে কঠোর হতে পারি, কিন্তু এতটা কঠোর নই।’