ভয়াবহ বিনিয়োগ সংকট : অবৈধ ইউনুস সরকারের অধীনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয়নামা
গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী ইয়াসির আজমানের সাম্প্রতিক মন্তব্য বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, তা মূলত একটি গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটের উপসর্গ মাত্র। টেলিকম খাতের করবৃদ্ধি বা আর্থিক বিরোধের চেয়ে বড় সমস্যা হলো, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে যে অবৈধ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার অধীনে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। একটি নির্বাচিত সরকারকে সুপরিকল্পিত দাঙ্গা ও সহিংসতার মাধ্যমে উৎখাত করে যে শাসনকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেখানে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসার কথা ভাবাটাই অবাস্তব। মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন এই তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার যে সাংবিধানিক কিংবা আইনগত কোনো ভিত্তি ছাড়াই ক্ষমতায় টিকে আছে, তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে গোপন কিছু নয়। জুলাই মাসে সারাদেশে যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়েছিল, তার পেছনে বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সামরিক বাহিনীর একাংশের সমর্থনের কথা এখন আর কেউ অস্বীকার করতে পারে না। একটি সুপরিকল্পিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল হয়, তখন সেই রাষ্ট্রে বিনিয়োগ করতে কোন বিবেকবান ব্যবসায়ী এগিয়ে আসবে? ইয়াসির আজমান বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ খুবই কম। কিন্তু তিনি যে মূল কারণটি এড়িয়ে গেছেন, সেটি হলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অবৈধ শাসনের উপস্থিতি। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, শুধু টেলিকম নয়, অন্যান্য খাতেও একই সংকট। এর কারণ স্পষ্ট। কোনো বিনিয়োগকারী এমন একটি দেশে টাকা ঢালতে চাইবে না, যেখানে আইনের শাসনের পরিবর্তে জঙ্গি সহিংসতা এবং সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তন হয়। গত দেড় বছরে যে নয় কোটি মোবাইল গ্রাহক কমেছে, তা শুধু অর্থনৈতিক মন্দার ফল নয়। এটি একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিফলন। মানুষ যখন জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে, যখন প্রতিদিন রাস্তায় নামলে কোনো না কোনো সহিংসতার সম্মুখীন হতে হয়, তখন মোবাইল সেবার খরচ বাড়ানো বা কমানো আর কোনো অর্থ বহন করে না। অর্থনীতির চাকা যে স্থবির হয়ে পড়েছে, তার মূলে রয়েছে এই রাজনৈতিক অবৈধতা। ইউনুসের এই অবৈধ সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, বিদেশি বিনিয়োগ তো দূরের কথা, দেশীয় পুঁজিও পালিয়ে বেড়াবে। কারণ একটি সামরিক সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত শাসনে কোনো স্থিতিশীলতা থাকে না। আজ যে মানুষ ক্ষমতায় আছে, কাল তাকেও আরেকটি রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার মাধ্যমে উৎখাত করা হতে পারে। এই অনিশ্চয়তার পরিবেশে কোনো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। গ্রামীণফোনের সিইও আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু কোন আইনি কাঠামোর অধীনে? একটি অবৈধ সরকারের সঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সালিশি কি আদৌ বৈধতা পাবে? এই প্রশ্নগুলো বিনিয়োগকারীদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ইউনুস ও তার দল যে কোনো মুহূর্তে যেকোনো সিদ্ধান্ত উল্টেপাল্টে দিতে পারে, কারণ তারা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ নয়, কোনো নির্বাচনী ম্যান্ডেট তাদের নেই। করের উচ্চহার নিয়ে অভিযোগ উঠছে বছরের পর বছর। কিন্তু একটি বৈধ সরকার থাকলে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের পথ খোলা থাকে। একটি অবৈধ দখলদার সরকারের সঙ্গে কোনো দীর্ঘমেয়াদী নীতি সংলাপ সম্ভব নয়। কারণ তারা আগামীকাল থাকবে কি থাকবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সুদের কারবার করে যে মানুষটি বিশ্বব্যাপী দরিদ্রদের শোষণ করে ধনী হয়েছে, সেই মানুষের নেতৃত্বে একটি রাষ্ট্র চললে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে, এমন আশা করাটাই হাস্যকর। জুলাইয়ের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে যখন রাস্তায় রাস্তায় রক্ত ঝরছিল, যখন সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস হচ্ছিল, যখন জনগণকে ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করা হচ্ছিল, তখন বিশ্ববাজারের বিনিয়োগকারীরা সব দেখছিল। তারা দেখেছে কীভাবে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সহিংসতার মাধ্যমে উৎখাত করা হয়েছে। তারা এটাও দেখেছে যে, এর পেছনে রয়েছে বিদেশি শক্তির অর্থ, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের সক্রিয়তা এবং সামরিক বাহিনীর একাংশের প্রত্যক্ষ মদদ। এই পরিস্থিতিতে তাদের কাছে বাংলাদেশ এখন একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগস্থল। বিটিআরসির পরিসংখ্যান বলছে, দেড় বছরে নয় কোটি গ্রাহক কমেছে। এর অর্থ হলো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এতটাই কমে গেছে যে তারা মোবাইল সেবা চালিয়ে যেতে পারছে না। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দায় কার? যারা একটি স্থিতিশীল সরকারকে উৎখাত করে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, তাদের। ইউনুস ও তার দল যতই উন্নয়নের বুলি আওড়াক না কেন, বাস্তবতা হলো তাদের আমলে দেশের অর্থনীতি তলানিতে ঠেকেছে। টেলিকম খাতের সমস্যা আসলে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় সংকটের একটি অংশ মাত্র। যে দেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নেই, যেখানে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে বন্দুকের নলের জোরে এবং জঙ্গি সহিংসতার মাধ্যমে, সেখানে ব্যবসায়িক পরিবেশ স্বাভাবিক থাকবে এমন আশা করা বোকামি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব করে না, তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তাও বিবেচনা করে। ইউনুসের অবৈধ সরকারের অধীনে এসবের কোনোটাই নিশ্চিত নয়। যতদিন বাংলাদেশে একটি বৈধ, নির্বাচিত এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন বিদেশি বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখা বৃথা। মোহাম্মদ ইউনুস এবং তার সহযোগীরা যে অবৈধ ক্ষমতা দখল করে রেখেছেন, তা শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, একটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও ডেকে এনেছে। গ্রামীণফোনের সিইওর মন্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে, অবৈধ শাসনের অধীনে কোনো খাতই সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা এবং একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা করা। অন্য সব কিছুই লোক দেখানো উদ্যোগ ছাড়া আর কিছু নয়।
