আওয়ামী লীগ সরকারের পতন: ভুল কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার ব্যবচ্ছেদ

১৫ মার্চ, ২০২৬ | ৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ
হাসান মোরশেদ , ডোনেট বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রেজিম চেঞ্জে পশ্চিমের( মার্কিন+ইউরোপ) সক্রিয়তা ছিলো- এই অনুসিদ্ধান্তে যদি দ্বিমত থাকে নির্দ্বিধায় এই আলাপ এড়িয়ে যেতে পারেন কারন মুল লেখাটি এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই। অন্য সবকিছু বাদ দিলেও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিটি প্রমাণ করে এখানে অনুগত সরকার তাদের জরুরী ছিলো। পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতিও সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশে রেজিম চেঞ্জের পর সিরিয়ার দীর্ঘ প্রতিরোধ শেষে অনুগত সরকার গঠন, ইরানে মরিয়া চেষ্টা, পরবর্তী টার্গেট সরে আসবে আরো পূর্বে মিয়ানমারে। মিয়ানমারের জন্য অগ্রবর্তী লঞ্চ প্যাড হবে বাংলাদেশ। উল্লেখিত সব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বাংলাদেশে রেজিম চেঞ্জ সবচেয়ে সহজ, সহজ কাজটি আগে করে রাখা হয়েছে। এই লেখার মুল উদ্দেশ্য তৎকালীন শাসক দল আওয়ামী লীগের রেজিম চেঞ্জ মোকাবেলা চেষ্টার ফরেন পলিসিগত ব্যর্থতা নিয়ে। বলাবাহুল্য একেবারেই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, দ্বিমত থাকলে বিতর্ক স্বাগত। কিন্তু ঘাড় ফুলিয়ে অভদ্র তর্ক নট এলাউড। বয়স হচ্ছে, এসব ভাল্লাগে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে বাই দ্য বুক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেই। এই বিরোধিতায় বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা নেতৃত্ব দেননি। তখন এখানে শক্তিশালী কমিউনিস্ট দুই দলের একদল বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে, আরেক দল দ্বিতীয় সারিতে ছিলো। নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ যেকোন অর্থেই কোন কমিউনিস্ট দল ছিলো না। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতাও তার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য ছিলো না। কিন্তু জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে মুলতঃ আঞ্চলিক অধিকার আদায়ের লড়াই তাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো এবং জাতীয়তাবাদী অহং নিয়ে আওয়ামী লীগ সেই লড়াই থেকে পিছু হটেনি। মধ্যবিত্ত, নিম্ন বিত্তের বুর্জোয়া দলটি এই গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলো। ইতিহাসে হয় এমন। কেউ কেউ তার নিজের যোগ্যতার চেয়ে মহৎ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রবাদপ্রতীম সাংগঠনিক দক্ষতা ও দেশপ্রেম, তখনকার পৃথিবীর আদর্শিক মেরুকরণ- মার্কিন বিরোধিতা স্বত্বেও বাংলাদেশ সৃষ্টির আশ্চর্য ঘটনা সম্ভব করেছিল। একুশ শতকের শুরুতে যখন আবার বিশ্বে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে, চীনের উত্থান ও রাশিয়ার গুছিয়ে নেয়ার প্রেক্ষিতে সোভিয়েত পতন পরবর্তী এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায় মার্কিন আগ্রাসন আবার শুরু হয়ে গেছে, আরব বসন্তের নামে “কালার রেভ্যুলেশন”- এর ল্যাবটেস্টে একে একে অনেকগুলো মার্কিন স্বার্থবিরোধী সরকারের পতন ঘটছে ঠিক ঐ সময়েই আবার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। এটা সম্ভবত আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ দুপক্ষেরই দুর্ভাগ্য। আওয়ামী লীগের জন্য আরো দুর্ভাগ্য হয়ে যায়- ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচনের ফলাফল। ঐতিহাসিকভাবে ভারতের কেন্দ্রে কংগ্রেস ও পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম- আওয়ামী লীগের জন্য সবসময় বেস্ট চয়েজ ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত নিজে দরিদ্র রাষ্ট্র হয়েও ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের জন্য যে আন্তর্জাতিক লড়াই করেছিল সেটি অবিস্মরণীয়। হেনরি কিসিঞ্জার- ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিব দুজনকেই ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণা করতো এবং তা প্রকাশে দ্বিধা করতো না। গঙ্গার পানি নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ন্যায্য ক্ষোভের কিছুটা আওয়ামী লীগ প্রশমিত করতে সক্ষম হয়েছিল ১৯৯৬ সালে যখন ভারতের কেন্দ্রে বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী আইকে গুজরাল ও পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম ছিলো। আমরা মনে রাখবো পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ আর তিস্তার পানির অধিকার আদায় করতে পারেনি যখন ভারতের কেন্দ্রে বিজেপি আর পশ্চিমবঙ্গে তৃণমুল। ফিরে আসি মুল আলাপে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় এলো। বিজেপি হচ্ছে ১৯২৫ সালে গঠিত হিন্দুত্ববাদী আরএসএস- এর ছায়া সংগঠন। হিন্দু মহাসভা, বজরং দল- এসব নানা নামে এরা থাকে। ইসলামিস্টদের যেমন ইসলামী ন্যাশনালিজমের এজেন্ডা, এদের তেমনি হিন্দু ন্যাশনালিজমের এজেন্ডা। অপরদিকে আওয়ামী লীগের হচ্ছে সেক্যুলার বাঙালী ন্যাশনালিজম। তাত্ত্বিক জায়গাতে পুরো বিপরীত। প্রায় সকল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা আবার সাম্রাজ্যবাদের দালাল। বৃটিশ আমলে- আরএসএস ও জামায়াত দুটাই ছিলো বৃটিশের পক্ষে। পরবর্তীতে দুটাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। জায়োনিস্টরাও তাই। বিজেপির বিরুদ্ধে ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কড়া সমালোচনা রয়েছে। অপরদিকে কংগ্রেসের পতন ও বিজেপির ক্ষমতারোহনে বিএনপির উল্লাস প্রকাশেরও সংবাদ রয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে বিজেপির সাথে ওয়ার্কিং রিলেশন তৈরী করতে হয়েছে, এর কোন বিকল্প ছিলো না। ছিটমহল বিনিময়, সমুদ্র সীমানা বৃদ্ধির মতো বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে একাধিক বিষয় ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ আদায় করতে সক্ষম হয়। অপরদিকে ভারতের সেভেন সিস্টার্সের বিদ্রোহীদের উচ্ছেদ করে ঐ অঞ্চলে ভারতের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাংলাদেশ স্থায়ী সমাধান করে দেয়, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধাও প্রদান করে। কিন্তু তিস্তার পানি চুক্তি ও সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিজেপি সরকার আওয়ামী লীগকে যথাযথ সহায়তা করেনি। এই সুযোগ বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের বিরোধী শক্তিগুলো লুফে নেয়। ধর্মীয় সংকীর্ণতার পাশাপাশি এই বিষয়গুলোকে পুঁজি করে ভারত বিদ্বেষ হয়ে উঠে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান কার্ড যা মোকাবেলা করা আওয়ামী লীগের জন্য কঠিন হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের জন্য আরো কঠিন হয়ে যায় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরো বেশী করে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। রাশিয়ার সহায়তায় পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, চীনের সহায়তায় অবকাঠামো উন্নয়নের বিশাল তোড়জোর, কৃষিখাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন- এসব মার্কিনিদেরকে ভাবিয়ে তোলে। শেখ হাসিনাও তাঁর বাবার মতো কমিউনিস্ট নন। কিন্তু জাতীয়তাবাদী হিসেবে এঁরা হচ্ছেন সেই ঘরানার রাজনীতিবিদ, যাঁরা একটা পর্যায়ের পর আর কম্প্রোমাইজ করবেন না, ঘাড় ত্যাড়ামি করবেন। অন্যরা যেখানে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে দেবতার মতো মানে সেখানে শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়, শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে মার্কিনিদের বিদেশনীতি নিয়ে সমালোচনা করে বসেন। এই ঘরানার রাজনীতিবিদ ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী তো বর্তমান বাস্তবতা নন, শেখ হাসিনার বাস্তবতা হচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি- যিনি আবার এই ঘরানার বিপরীত। যতোটা না রাজনীতিবিদ, তারচেয়ে বেশি সেলস পার্সন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের কতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সেটা প্রমাণের জন্য তার হাস্যকর চেষ্টা। মোদির ভারত এসময় নিজের ইম্প্রেশন গড়ে তোলে- যেন তারা দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন প্রতিনিধি। এখানে মার্কিনিরা তাদের অনুমোদন ছাড়া রেজিম চেঞ্জের কোন অপারেশন চালাবে না। আওয়ামী লীগ চুড়ান্ত ধরা খায় ঠিক এখানেই। দেশের ভেতরে শেখ হাসিনা-বিরোধী যতো শক্তি, সবাইকে মার্কিনিরা জোটবদ্ধ করতে সক্ষম হয়। বাম, ডান, অ্যাক্টিভিস্ট, এক্সট্রিমিস্ট সকলকেই। আওয়ামী লীগের ভেতরেও তারা সক্রিয় হয়। ফলে শেখ হাসিনার প্রধান যে শক্তি- তাঁর সংগঠন ও কর্মীবাহিনী, সেটি উপেক্ষিত হতে হতে নির্জীব হয়ে পড়ে। সরকার ও দল পুরোপুরি চলে যায় সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও সস্তা সেলিব্রেটিদের দখলে। অপরদিকে শেখ হাসিনার মার্কিনবিরোধিতা খুব স্পষ্ট, রাখঢাকহীন হয়ে উঠতে থাকে। নরেন্দ্র মোদির বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠতাও। সম্ভবত: তাঁকে তাঁর উপদেষ্টারা এমন ধারণা দিয়েছিলেন- মার্কিনিরা ক্ষেপলেও ভারতকে ডিঙিয়ে কিছু করবে না। এই ভরসা তাঁকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। বাংলাদেশের মার্কিন পলিসিতে তিনি ভারতকে ঢাল ভাবেন। শেষ পর্যন্ত যা ঘটে- তাতে প্রমাণিত হয়- মার্কিনিরা “বাংলাদেশ রেজিম চেঞ্জ” অপারেশনে ভারতকে পাত্তা দেয়নি, নিজেদের কাজ নিজেরাই করেছে। অথবা ভারত অবগত হলেও অসম্মত হবার মতো জোর তার ছিলো না। নরেন্দ্র মোদির চরিত্র অনুযায়ী এটিই স্বাভাবিক। তিনি ইন্দিরা গান্ধী নন, যিনি হেনরি কিসিঞ্জারকে কড়া জবাব দিতে পারতেন, বাণিজ্যের বদলে নীতি ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তুলতে পারতেন। তবে ভারত সম্ভবতঃ শেখ হাসিনাকে প্রাণে রক্ষা করার অপশনটুকু মার্কিনিদের থেকে আদায় করতে পেরেছিলো। শেষ করি শেষ এসাম্পশান দিয়ে। যদি চীন ও রাশিয়া খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে ইরানের পাশে দাঁড়ায়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। তা না হলে শেষ পর্যন্ত ইরানের পতন হবে। ইরানের পর মার্কিন আগ্রাসন আরো পূর্বমুখী হবে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার। পাকিস্তান তাদের হাতে আছে। আফগানিস্তান একটু ডিস্টার্বিং হতে পারে। ভারতও হাতে। বাংলাদেশ একেবারে মুঠোর মধ্যে। নেক্সট বিগ মুভ মিয়ানমার। সাউথ এশিয়া,ঘোষিত বা অঘোষিত বিশ্বযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ থিয়েটার। অনেকবছর পর যখন এই ইতিহাসের চুড়ান্ত পর্ব লেখা হবে, সেখানে বাংলাদেশের শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের উল্লেখ অবশ্যই থাকবে। অন্যদেরও থাকবে। যে যা ভূমিকায় ছিলেন, আছেন- সেই অনুযায়ীই স্থান নির্ধারিত হবে নিশ্চিত। লেখক পরিচিতি: লেখকম, মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা বিষয়ক গবেষক