পাতানো নির্বাচনে জামায়াতকে ক্ষমতায় বসানোর নীল নকশা কি চূড়ান্ত?
সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে কর্মরত একজন মার্কিন কূটনীতিকের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামের সাথে বন্ধুন্তপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে চায়। গত ১ ডিসেম্বরে বাংলাদেশের কয়েকজন নারী সাংবাদিকের সাথে ঘরোয়া আলোচনায় উক্ত কূটনীতিক এই বক্তব্য করেন। ওয়াশিংটন পোষ্ট সেই বক্তব্যের একটি অডিও রেকর্ডের উপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করে। উক্ত কূটনীতিক আশাবাদ প্রকাশ করেন জামায়াত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অতীতের তুলনায় অনেক ভাল করবে। তিনি সাংবাদিকদের জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলেন। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন করতে পারে- নারী সাংবাদিকদের এমন আশংকার প্রেক্ষিতে মার্কিন কূটনীতিক বলেন, তিনি মনে করেন না জামায়াত শরীয়াহ বাস্তবায়ন করবে। করলেও ওয়াশিংটন শুল্ক আরোপের মতো ব্যবস্থা গ্রহন করবে। এই কূটনীতিককে আরো বলতে শোনা যায় জামায়াতে ইসলামে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট অনেক নেতৃত্ব রয়েছে, তারা এমন সিদ্ধান্ত নিবে না। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত ইতিহাসের সেরা ফল করবে, এমনকি ক্ষমতায়ও আসতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাজানো নির্বাচনের মাত্র ২০ দিন আগে ওয়াশিংটন পোস্টের এমন প্রতিবেদন কি নিছকই কোন অডিও লিকের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে? আমার তা মনে হয় না। প্রথমত বাংলাদেশের কোন সাংবাদিক মার্কিন কূটনীতিকের সাথে রুদ্ধদ্বার কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করে, সেটা ওয়াশিংটন পোস্টে পাঠিয়ে দিবে এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন। দ্বিতীয়ত ওয়াশিংটন পোষ্ট নিশ্চয়ই ওই কূটনীতিকের সাথে অডিওর বিষয়টি ক্রসচেক করেছে। অতএব তার আপত্তি থাকলে এটা নিয়ে প্রতিবেদন করার কথা না। আমার ধারণা ঐ কূটনীতিক তথা মার্কিন দূতাবাসের পরিকল্পনা অথবা সম্মতিতেই এটা প্রকাশিত হয়েছে। এটি দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি সফট সিগনাল বলা যায়। এর মাধ্যমে তারা জামায়াতে ইসলামের প্রতি একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো একই সময়ে পর দুই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স এবং আল জাজিরাতেও জামায়াতে ইসলাম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। উভয় প্রতিবেদনেই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতের ভাল ফলাফলের বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে যে ভাষায় জামায়াতের উদ্বাহু প্রশংসা করা হয়েছে তাতে সহজেই অনুমেয় এগুলো পেইড ক্যাম্পেইন। সম্প্রতি আল জাজিরার এক জরিপে তো জামায়াতের জনসমর্থন ৩৩.৬% দেখানো হয়েছে যেখানে বিএনপির জনসমর্থন দেখানো হয়েছে ৩৪.৭%। এই ক্যাম্পেইন গুলোর মাধ্যমে জামায়াত মূলত নিজেদেরকে ভবিষ্যৎ ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টাকে ন্যাচারালাইজ করার চেষ্টা করছে। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে জামায়াত কি আসলেই ক্ষমতায় যেতে পারবে? শতকরা হিসেবে জামায়াত সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল ১৯৯১ এর নির্বাচনে। সেবার তারা পেয়েছিল ১২.১৩ শতাংশ ভোট। পরের তিনটি নির্বাচনে তাদের ভোটের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮.৬৮%, ৪.২৮% ও ৪.৭%। অর্থাৎ স্বাভাবিক নির্বাচনে জামায়াতের ভোটের পরিমাণ ডাবল ডিজিট হবার কথা না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে যে সাজানো নির্বাচন করতে যাচ্ছে তাতে ক্ষমতার মসনদে জামায়াতের বসানোর জন্য পর্দার আড়ালে নানান খেলাধুলা চলছে। মার্কিন কূটনীতিকের অডিও ফাঁস, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জামায়াতের পক্ষে ইতিবাচক প্রতিবেদন ও সাজানো জরিপের ফল প্রকাশ সেই প্রক্রিয়ারই অংশ। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ৫ই আগষ্ট পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধানের দেয়া প্রথম বক্তব্যে তিনি একাধিক বার জামায়াতের আমীরকে “আমীরে জামায়াত” হিসেবে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সম্বোধন করেছিলেন। এরপর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে জামায়াত একচেটিয়া ভাবে কর্তৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপির পালে আলতো হাওয়া দিলেও দেশের রাজনীতির নাটাই এখন জামায়াতের দখলে। আওয়ামীলীগকে মব সন্ত্রাস, জুলুম, নির্যাতন ও বিচারিক হয়রানির মাধ্যমে রাজপথ দূরে রাখার ফলে জামায়াত সহজেই এই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। রাষ্ট্রের সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ অর্গানগুলো এখন জামায়াতের দখলে। সেনাবাহিনীতে চলছে ইসলামিকরনের নামে জামায়াতিকরণ। রাজাকার শিরোমনি গোলাম আজমের ছেলে আবদুল্লাহ হিল আজমির গুমের অভিযোগে কারাগারে রয়েছে ১৫ জন ডেকোরেটেড সেনাকর্মকর্তা। যদিও তিনি আদৌ গুম হয়েছিলেন কিনা সেটাও নিশ্চিত না। দেশের বিচারবিভাগ বলা চলে পুরোটাই জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ বিশেষ করে ডিসি, এসপি, ইউএনও ও ওসিদের বেশিরভাগ জামায়াতপন্থীদের দখলে। সাজানো ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে একক আধিপত্য বিস্তার করেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের উপাচার্য নিয়োগেও জামায়াত পন্থীদের আধিপত্য। ২০২৪ এর আগষ্ট পরবর্তী সময়ে জামায়াতের নেতাদের সাথে ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্তৃপক্ষের অন্ততপক্ষে চারটি বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাসের সাথে তাদের নিবিড় যোগাযোগ তো রয়েছেই। এছাড়া যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনারের সাথে জামায়াতে ইসলামের আমীরের একাধিক বৈঠক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই কিছুদিনে আগে জামায়াতে আমীর যুক্তরাজ্যে সফর করে গিয়েছেন। অর্থাৎ জামায়াত তার প্রতিষ্ঠার পর এমন ফেভারেবল কন্ডিশনে আগে কখনো পৌঁছায় নি। এমনকি তাদের জন্মস্থান পাকিস্তানেও না। স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে কেন পশ্চিমা বিশ্বের একাংশ জামায়াতকে চাচ্ছে? ডঃ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারেরই বা কি লাভ এতে? তাদের ভূমিকাই বা কি? বর্তমানের অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এনডিএ চুক্তি সহ বিবিধ বাণিজ্য চুক্তি করেছে যার সবগুলোই জনস্বার্থ বিরোধী। এর কিছু হয়তো প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু অনেক কিছু এখনো অপ্রকাশিত। তারা স্বভাবতই তাদের এই সকল চুক্তিসমূহের নিরাপত্তা চায়। একই সাথে তারা চায় বাংলাদেশের রাজনীতি এবং ভূখন্ডের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য সুদৃড় করা এবং একাধারে চীন ও ভারতের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বাংলাদেশের ভূখন্ড তাদের প্রয়োজন। এবং এটা তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারই অংশ। জনসমর্থনহীন জামায়াতকে ক্ষমতায় বসাতে পারলে তারা নির্দ্বিধায় তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারবে। কেননা স্বাধীনতাবিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের স্বভাবতই বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা নেই। ক্ষমতায় যাবার বিনিয়মে যেকোন বৈদেশিক শক্তিকেই তারা ব্লাঙ্ক চেক দিবে। এবার আসা যাক ইউনূস প্রসঙ্গে। ক্ষমতা দখলের পর থেকে এখন অব্দি ইউনূস তার সকল ব্যক্তিস্বার্থ ইতোমধ্যেই চরিতার্থ করেছে। তার সকল অনুচরদের রাষ্ট্রীয় পদ পদবি দিয়ে দু হাতে অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। তার নিয়োগকর্তা “ডিপস্টেট” এর সকল চাহিদা সে মিটিয়ে ফেলেছে। এটি করতে গিয়ে প্রতিটি পদে পদে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে। আর ইউনূসের সকল সিদ্ধান্তে জামায়াত শুরু থেকেই নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে গিয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ইউনূসের মূল চাহিদা হবে তার এবং তার অনুসারিদের সেফ এক্সিট। একই সাথে জুলাইয়ের মূল স্টেক হোল্ডার হিসেবে দাবিকৃত ছাত্র নেতাদের ভবিষ্যত সিকিউর করার বিষয়টিও এখানে জড়িত । এই ক্ষেত্রেও জামায়াত এগিয়ে এসেছে। ইতোমধ্যেই এনসিপি জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে। আন্তর্জাতিক লবি ঠিক রাখতে জামায়াত ইউনূসের সেফ এক্সিট নিশ্চিত করবে। এমনকি রাষ্ট্রপতি পদে বসালেও বসাতে পারে। প্রশ্ন আসতে পারে বিএনপি কি করবে? বিএনপির আপাতত চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া খুব বেশি কিছু করার নেই। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে বিএনপি ইউনূস গং এর দেশবিরোধী সকল কিছুতে সায় দিয়ে গিয়েছে। মীর্জা ফখরুল তো ইউনূসের মাঝে জিয়াকেই খুঁজে পেয়েছেন। স্বয়ং তারেক রহমানকেও একাধিকবার ইউনূস বন্দনা করতে দেখা গিয়েছে। সবই ছিলো শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাবার জন্য। তবে আদতে তারা রাজনীতির মূল খেলাটাই ধরতে পারেনি। তাছাড়া তাদের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, জুলুম সন্ত্রাস করে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে দৃশ্যমান অনিয়ম হওয়া সত্ত্বেও ছাত্রদল নূন্যতম প্রতিবাদ টুকু করেনি বা করতে পারেনি। ১২ ফেব্রুয়ারির সাজানো নির্বাচনে জামায়াত ক্ষমতায় গেলেও বিএনপির কিছুই করার থাকবে না। বাংলাদেশীদের দূর্ভোগ সহসাই শেষ হবার কোন লক্ষন আপাতত নেই। একটি মেটিক্যুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে যেমন নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানো হয়েছে, ঠিক তেমন আরেকটি মেটিক্যুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামকেও ক্ষমতায় বসানোর নীল নকশা চূড়ান্ত করা হচ্ছে বৈদিশিক শক্তির সহায়তায়। ইউনূসের সকল দেশবিরোধী চুক্তি বাস্তবায়িত হবে জামায়াতের হাত ধরে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সংবিধান ছুঁড়ে ফেলা হবে আস্তাকুড়ে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, নারী স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুর অধিকার এই বিষয়গুলোকে পাঠিয়ে দেয়া হবে হীমাগারে। বাংলাদেশ হবে ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ!
