তিন ঘণ্টা বসে পাঁচ লিটার তেল, এটাই বিএনপি সরকারের কৃষিনীতি

৬ এপ্রিল, ২০২৬ | ১০:৪৭ অপরাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , ডোনেট বাংলাদেশ

পাবনার কৃষক আলামিন ৫০ টাকা রিকশাভাড়া দিয়ে শহরে এসেছেন ডিজেল কিনতে। দুই-তিন ঘণ্টা পাম্পস্টেশনে বসে থেকে পেয়েছেন পাঁচ-দশ লিটার। বাড়ি ফিরে গেছেন, দুই দিন পর আবার আসবেন। পাঁচ বিঘা জমিতে বোরো ধান লাগানো আছে, সেচ না দিলে ধান মরবে। কিন্তু ডিজেল নেই। এই হলো ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের কৃষি ব্যবস্থাপনার আসল চেহারা। তয়েব মোল্লার সাত বিঘা জমিতে ধানের বয়স পনেরো দিন। এই বয়সে সেচ না পেলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে, এটা যেকোনো কৃষকই জানেন। তয়েব মোল্লাও জানেন। কিন্তু সরকার জানে কিনা সেটা নিয়েই প্রশ্ন। কারণ জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে তেলের কোনো সংকট নেই, সরবরাহ আগের চেয়ে বরং বেড়েছে। অনন্তবাজারের পেট্রল পাম্পের ম্যানেজার বলছেন, ডিজেল যতটুকু পাচ্ছেন মুহূর্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। মন্ত্রী বলছেন সংকট নেই। আসমান আর জমিনের মধ্যে যে দূরত্ব, এই সরকার আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্বটা ঠিক ততটাই। গত সতেরো বছর এই দেশে বোরো মৌসুমে ডিজেল সংকটের এই ছবি কেউ দেখেননি। সেচের মৌসুমে জ্বালানি সংকট হওয়া মানে সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের উপর আঘাত, এটা বোঝার জন্য কৃষি বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। কিন্তু ফেব্রুয়ারির বারো তারিখে বড় বড় দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণের বয়কট উপেক্ষা করে, নিজেদের মধ্যে একটা ভোটের নাটক সাজিয়ে যে সরকার গদিতে বসেছে, তাদের কাছে কৃষকের সমস্যা মাথায় রাখার অবকাশটুকু আছে বলে মনে হচ্ছে না। বিএনপি যে দলটি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া, সেনানিবাসের ছায়ায় বড় হওয়া, দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের দীর্ঘ ইতিহাস যাদের পিছু ছাড়েনি কখনো, তারা এখন মন্ত্রিত্বের মসনদে বসে বলছে কৃষকদের ভোগান্তি শিগগির কেটে যাবে। কাটবে কীভাবে? কবে? এই প্রশ্নের জবাব নেই। কৃষি বিভাগের দাবি আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে কোনো মিল নেই। হিসাবটা সরল। এক বিঘা বোরো জমিতে তিন মাসে পঞ্চাশ লিটার ডিজেল লাগে। খরচ পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। ধান বিক্রি করে হাতে আসে বিশ হাজারের মতো। মোট খরচ আঠারো থেকে বিশ হাজার। মানে লাভ বলতে কিছু নেই, খড়টুকু পাওয়া যায়। এরপর যদি ডিজেল খোলাবাজার থেকে পঞ্চাশ-ষাট টাকা বেশি দামে কিনতে হয়, তাহলে সেই খড়ের লাভটুকুও আর থাকে না। কৃষক শেষ পর্যন্ত লোকসান নিয়ে ঘরে ফেরেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ডিজেল সংকট হচ্ছে, এই ব্যাখ্যা সরকারের তরফ থেকে আসছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ নতুন কোনো ঘটনা না। সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা, মজুত পরিকল্পনা, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি, এগুলো করার দায়িত্ব সরকারের। জনগণের ভোটে না আসা একটি সরকারের কাছে জবাবদিহিতা চাওয়ার জায়গাটাও সীমিত হয়ে যায়, এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। চাটমোহরের আব্দুল হাকিম বলছেন, গত বছর তিনশো পঞ্চাশ টাকায় এক বিঘা জমি চাষ দিয়েছেন, এবার চারশো পঞ্চাশ টাকা লাগছে। লেবারের দামও বেড়েছে। সার বস্তায় হাজার টাকা বেড়েছে। সব দিক থেকে চাপ বাড়ছে, কিন্তু ধানের দাম বাড়েনি। এই চাপটা কৃষক একা বহন করছেন, আর সংসদে মন্ত্রীরা বলছেন সংকট নেই। পাবনা জেলায় এবার বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ছাপান্ন হাজার হেক্টরের বেশি। আবাদ হয়েছেও প্রায় সেটুকু। কিন্তু বিশ হাজার হেক্টরের বেশি জমি ডিজেলচালিত সেচের উপর নির্ভরশীল। এই জমির ফসল ঠিকঠাক ঘরে আসবে কিনা, সেটা নির্ভর করছে সরকার আদৌ পরিস্থিতিটাকে গুরুত্ব দিচ্ছে কিনা তার উপর। এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, মাঠে সংকট আর দপ্তরে অস্বীকার, এটাই এই সরকারের চরিত্র।