ইউনুসের সংস্কারনামা : টাকা দিলেই ‘আওয়ামী’ বানিয়ে জেলে পাঠানো যায় এখন

২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ | ৬:৫০ অপরাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , ডোনেট বাংলাদেশ

চট্টগ্রামের হালিশহর থানার ঘটনাটা শুনলে মনে হবে এ কোন দেশে বসবাস করছি আমরা? একজন ফার্মেসি মালিক, যিনি ১৮ বছর প্রবাসে থেকে সৎ পরিশ্রমের টাকায় দেশে ফিরে ছোট ভাইকে নিয়ে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন, তাকে জমির বিরোধের জেরে 'আওয়ামী লীগ ট্যাগ' দিয়ে সন্ত্রাসী বানিয়ে জেলে পাঠানো হলো। সন্তোষ চন্দ্র নাথের অপরাধ কী? তিনি কি কোনোদিন মিছিল করেছেন? রাজনীতি করেছেন? না। তার অপরাধ, তার জমি নিয়ে বিরোধ আছে, আর প্রতিপক্ষের পকেটে টাকা আছে থানা পুলিশকে খুশি করার মতো। ডক্টর ইউনুসের তথাকথিত সংস্কারের সরকার ক্ষমতায় দখলের পর থেকে বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে পুলিশ এখন ভয়াবহ বেপরোয়া। যার টাকা আছে, যার ক্ষমতার সাথে যোগাযোগ আছে, সে যাকে ইচ্ছা 'আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী' বানিয়ে জেলে পাঠাতে পারছে। সংস্কারের নামে এ দেশে শুরু হয়েছে এক ভয়ংকর স্বেচ্ছাচারিতা। হালিশহর থানা পুলিশ সন্তোষ চন্দ্রকে তার ফার্মেসি থেকে তুলে নিয়ে গেছে রাত সাড়ে আটটায়। অথচ আদালতে পাঠানোর ফরোয়ার্ডিংয়ে লেখা হয়েছে, চুনা ফ্যাক্টরি মোড় থেকে রাত সাড়ে নয়টায় তাকে আটক করা হয়েছে। কেন এই মিথ্যাচার? কারণ ফার্মেসির সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে যাবে পুলিশের আসল চেহারা। তাই এএসআই হান্নান হোসেন নিজ হাতে সিসিটিভি ডিভাইস খুলে নিয়ে গেছেন। এটাই কি আইনের শাসন? এটাই কি সংস্কার? পাশের দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে, যেখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে পুলিশ কীভাবে দোকানে ঢুকে প্রমাণ লোপাট করছে। কিন্তু এই প্রমাণ কি কোনো কাজে আসবে? আদালতে কি সন্তোষ চন্দ্র নাথ ন্যায়বিচার পাবেন? নাকি তিনি মাসের পর মাস জেলে পচবেন, আর তার প্রতিপক্ষ তার জমি দখল করে নেবে? ফরোয়ার্ডিংয়ে যা লেখা হয়েছে, তা পড়লে হাসি পাবে না কান্না পাবে বুঝতে পারবেন না। নভেম্বরের ২১ তারিখে নাকি সন্তোষ চন্দ্র 'টাকার বিনিময়ে সরকারবিরোধী স্লোগান' দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, কোথায় দিয়েছেন? কখন দিয়েছেন? সাক্ষী কে? প্রমাণ কী? কিছুই নেই। শুধু আছে পুলিশের একতরফা বয়ান। আর সেই বয়ানে লেখা, 'প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সন্তোষ চন্দ্র নাথ স্বীকার করেছেন'। কী স্বীকার করেছেন? যা কখনো করেননি, তা স্বীকার করেছেন? নাকি থানায় নিয়ে জবরদস্তি করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে? এটা শুধু সন্তোষ চন্দ্রের ঘটনা নয়। একজন প্রাইভেটকার চালক কফিল উদ্দিনকে হালিশহর থানা থেকে তুলে নিয়ে বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমানের ওপর হামলার মামলায় জেলে পাঠানো হয়েছিল। তিনি এক মাস দশ দিন জেল খেটে বের হয়েছেন। তার অপরাধ কী ছিল? কিছুই না। তিনি কখনো রাজনীতি করেননি, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। কিন্তু তবুও তাকে জেলে যেতে হলো। চক্ষু হাসপাতালের কর্মচারী পাভেল, নৈশপ্রহরী মামুন, এরা কারা? এরা কি সন্ত্রাসী? এরা কি দেশবিরোধী? না। এরা সাধারণ মানুষ, যারা তাদের পরিবার নিয়ে সৎভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাদেরকে 'আওয়ামী ট্যাগ' দিয়ে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। কেন? হয় থানা পুলিশের 'অ্যাচিভমেন্ট' দেখাতে হবে, নয়তো কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে হবে। আগে যদি আওয়ামী লীগ করেও থাকতেন কেউ, তবুও তাকে আইনের বাইরে গিয়ে নির্যাতন করা অন্যায়। কিন্তু এখন যারা কখনো রাজনীতি করেননি, যাদের সাথে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই, তাদেরকেও 'আওয়ামী ট্যাগ' দিয়ে জেলে পাঠানো হচ্ছে। এর মানে কী? এর মানে হলো, এটা এখন একটা টুল হয়ে গেছে। যে কেউ, যে কারণেই হোক, তার প্রতিপক্ষকে ঠেলে দিতে পারছে জেলে। শুধু দরকার থানা পুলিশের সাথে একটু যোগাযোগ, আর হাতে কিছু টাকা। সন্তোষ চন্দ্রের প্রতিবেশী এবং হালিশহর থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, এলাকার সবাই জানে সন্তোষ চন্দ্র এবং তার ভাই কখনো রাজনীতি করেননি। কিন্তু সেই সাক্ষ্য কি কাজে লাগছে? না। কারণ ফরোয়ার্ডিংয়ে পুলিশ যা লিখে দিয়েছে, আদালত সেটাই বিবেচনা করবে। আর পুলিশ লিখেছে, সন্তোষ চন্দ্র স্বীকার করেছেন তিনি সরকারবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন। কিশোর কুমার নাথ, যিনি বিজ্ঞান কুমার নাথের খালাতো ভাই, তিনি পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, জমি-জমার বিষয়টি সমাধান হয়ে গেলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। মানে কী? মানে হলো, এটা একটা দরকষাকষির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমি ছেড়ে দাও, তাহলে মামলা তুলে নেওয়া হবে। জমি না ছাড়লে জেলে পচো। এটা কোন ধরনের বিচারব্যবস্থা? এটা কোন ধরনের সংস্কার? হালিশহর থানার ওসি কাজী মুহাম্মদ সুলতান আহসান উদ্দীনকে যখন প্রশ্ন করা হলো, তিনি বললেন, 'ফরোয়ার্ডিংয়ে যেখানে লেখা আছে সেখান থেকেই আটক করা হয়েছে।' সিসিটিভি ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'আপনি থানায় আসেন, তারপর দেখা যাবে।' এটাই হলো জবাবদিহিতার নমুনা। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো যুক্তি নেই, শুধু ঔদ্ধত্য। ফেসবুক থেকে ছবি তুলে ফটোশপ করে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা এখন একটা ইন্ডাস্ট্রি হয়ে গেছে। থানায় টাকা দিলে যে কাউকে 'অজ্ঞাত', 'তদন্তে প্রাপ্ত', বা 'সন্দিগ্ধ' আসামি বানিয়ে আদালতে পাঠানো যাচ্ছে। এই যে নৈরাজ্য, এই যে আইনহীনতা, এর দায় কার? দায় তো তাদের, যারা ক্ষমতায় বসে আছেন। দায় তো ডক্টর ইউনুসের, যিনি এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। তারা বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে সংস্কার করবেন। ঠিক আছে, সংস্কার করুন। কিন্তু সংস্কারের নামে তো অরাজকতা চলতে দেওয়া যায় না। সংস্কারের নামে তো নিরপরাধ মানুষকে জেলে পাঠানো যায় না। যদি সত্যিই সংস্কার করতে চান, তাহলে আগে এই থানা পুলিশের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করুন। যদি সত্যিই আইনের শাসন চান, তাহলে মিথ্যা মামলা দেওয়া বন্ধ করুন। যদি সত্যিই মানুষের অধিকার রক্ষা করতে চান, তাহলে সন্তোষ চন্দ্র নাথ, কফিল উদ্দিন, পাভেল, মামুনদের মতো নিরপরাধ মানুষদের মুক্তি দিন। কিন্তু তারা করবেন না। কারণ তারা জানেন, এই মিথ্যা মামলা, এই ভয়ভীতি, এই নিপীড়ন, এসবের মধ্য দিয়েই তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন। মানুষ যখন ভয়ে থাকবে, যখন জানবে যে যে কোনো সময় তাকে 'আওয়ামী ট্যাগ' দিয়ে জেলে পাঠানো হতে পারে, তখন সে মুখ খুলবে না। তখন সে প্রশ্ন করবে না। তখন সে হিসাব চাইবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে অনেক কিছু দেখেছি। কিন্তু এভাবে একটা রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে নিরপরাধ মানুষদের ফাঁসানোর এই সিস্টেমেটিক প্রক্রিয়া, এটা নতুন। এটা বিপজ্জনক। এটা দেশকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হবে। যখন আইন হয়ে যায় প্রতিশোধের হাতিয়ার, যখন পুলিশ হয়ে যায় টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা গুণ্ডা, যখন আদালত হয়ে যায় শুধু একটা রাবার স্ট্যাম্প, তখন সেই দেশে আর কোনো নিরাপত্তা থাকে না। তখন প্রতিটি মানুষ জানে, আজ অন্যের পালা, কাল হয়তো তার। ডক্টর ইউনুস বিদেশে গিয়ে বড় বড় বক্তৃতা দেন গণতন্ত্র নিয়ে, মানবাধিকার নিয়ে। কিন্তু তার নিজের দেশে, তার নিজের সরকারের অধীনে, একজন ফার্মেসি মালিককে জমির বিরোধের জেরে জেলে পাঠানো হচ্ছে মিথ্যা মামলায়। এই বৈপরীত্য তিনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড তিনি কীভাবে জাস্টিফাই করবেন? দেশ এখন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। মানুষ জানে না, কখন তাদের দরজায় থানা পুলিশ এসে কড়া নাড়বে। জানে না, কখন তাদেরকে 'আওয়ামী ট্যাগ' দিয়ে ফাঁসানো হবে। এই যে ভয়, এই যে অনিশ্চয়তা, এটাই হলো সবচেয়ে বড় সমস্যা। কারণ যে দেশে মানুষ নিরাপদ বোধ করে না, যে দেশে আইন মানুষের সুরক্ষার বদলে মানুষের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, সেই দেশে কোনো উন্নয়ন হয় না, কোনো প্রগতি হয় না। সন্তোষ চন্দ্র নাথ আজ জেলে আছেন। তার অপরাধ, তার একটা জমি আছে যেটা অন্য কেউ দখল করতে চায়। এটাই তার অপরাধ। আর এই অপরাধের শাস্তি পেতে তাকে হতে হয়েছে 'আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী', তাকে স্বীকার করতে হয়েছে যা তিনি কখনো করেননি। এটাই হলো আজকের বাংলাদেশ। এটাই হলো ডক্টর ইউনুসের সংস্কারের নমুনা।