জুলাই দাঙ্গার নায়করা নির্বাচনে, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মৃত্যুর প্রহর গুনছে
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সাম্প্রতিক জরিপ যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, তা মূলত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত দাঙ্গা এবং তৎকালীন সরকার উৎখাতের পর থেকে সৃষ্ট অরাজকতার সরাসরি ফলাফল। ৫০৫ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পরিচালিত এই জরিপে যে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ আসন্ন নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ২৫ শতাংশের বেশি নিজেদের অনিরাপদ মনে করছেন, তা আসলে সংখ্যাগত পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়ংকর বাস্তবতা। বাস্তবে প্রায় শতভাগ সংখ্যালঘু মানুষই এখন আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন, কারণ ১২ ফেব্রুয়ারির পর তাদের ওপর কী ধরনের নতুন নিপীড়ন নেমে আসবে, সেই অজানা আশঙ্কা তাদের প্রতিটি মুহূর্তে তাড়া করে ফিরছে। যে সরকার বিদেশি অর্থায়নে, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় এবং সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সমর্থনে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারের কাছ থেকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আশা করাটাই হাস্যকর। ইউনুস এবং তার অবৈধ সরকার গত কয়েক মাস ধরে যে অপশাসন চালিয়ে যাচ্ছে, তার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী এই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। জুলাই মাসের দাঙ্গার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর যে ধরনের হামলা, লুটপাট, ঘরবাড়ি জ্বালানো এবং ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, তার কোনো বিচার হয়নি। বরং যারা এসব অপরাধ করেছে, তারা এখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নিরাপদ। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মন্তব্য যে অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতা শেষ সীমায় চলে গেছে, তা আসলে একটি নরম সমালোচনা মাত্র। বাস্তবতা হলো এই সরকারের কখনো কোনো সক্ষমতা ছিলই না, কারণ এরা একটি অবৈধ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেছে। যে সরকারের নিজের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ, সেই সরকার কীভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করবে? সংখ্যালঘুদের মধ্যে যে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে, তা এই সরকারের চরম ব্যর্থতার প্রমাণ। নির্বাচন যদি সত্যিকার অর্থে সবার জন্য অংশগ্রহণমূলক হতো, তাহলে সংখ্যালঘুরা এতটা ভীত থাকতেন না। এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সংখ্যালঘুরা শুধু নির্বাচন নিয়েই নয়, নির্বাচন-পরবর্তী সময় নিয়ে আরও বেশি শঙ্কিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আরও ভিন্ন এবং ভয়াবহ, কারণ যে শক্তিগুলো বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে, তারা মূলত সাম্প্রদায়িক শক্তি। ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের কাছ থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আশা করা অবাস্তব। ইউনুস সরকার গত আঠারো মাস ধরে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যে রাজনৈতিক কূটকৌশল চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা তাদের কাছে কোনো বিবেচ্য বিষয়ই নয়। বিশেষত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা তো একেবারেই নয়। যে সরকারের পেছনে রয়েছে জঙ্গি সংগঠন, বিদেশি শক্তি এবং সামরিক বাহিনীর একাংশ, সেই সরকার কখনো দেশের সব নাগরিকের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। সংখ্যালঘুরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, এবং আসন্ন নির্বাচন তাদের জন্য আরও ভয়ংকর এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যেসব রাজনৈতিক দল এবং গোষ্ঠী জুলাই মাসের দাঙ্গায় সক্রিয় ছিল, তারা এখন নির্বাচনী প্রচারণায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদের অনেকেই প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়ে আসছে, কিন্তু ইউনুস সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এই নীরবতা আসলে সংখ্যালঘু বিরোধী শক্তিকে পরোক্ষ সমর্থন দেওয়ার সামিল। যে দেশে ৫০ শতাংশের বেশি সংখ্যালঘু মানুষ নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ২৫ শতাংশের বেশি নিজেদের অনিরাপদ মনে করেন, সেই দেশে নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা কেবল মুখের কথা। ইউনুস এবং তার সরকার যে বৈধতাহীন এবং অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেছে, তার মূল্য এখন দিতে হচ্ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে। এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা বোকামি। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার, তার কিছুই এই সরকারের নেই। বরং তারা যেভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে, তাতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নতুন করে আক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়ে গেছে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য যখন বলেন যে নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, তখন প্রশ্ন আসে, কীভাবে? যে সরকার নিজেই একটি অবৈধ প্রক্রিয়ার ফসল, সেই সরকার কীভাবে একটি বৈধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আয়োজন করবে? সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা যখন বলছেন তারা উদ্বিগ্ন এবং অনিরাপদ, তখন সেটা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটা একটি জাতির বিবেকের প্রতি প্রশ্ন। ইউনুস সরকার গত আঠারো মাস ধরে যে ধরনের শাসন চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে এই সরকারের কাছে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কোনো অগ্রাধিকার নয়। বরং তারা যেসব শক্তির ওপর নির্ভরশীল, সেসব শক্তিই সংখ্যালঘু বিরোধী। এই পরিস্থিতিতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির পর কী ঘটবে, সেই আশঙ্কা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রতিদিন তাড়া করে ফিরছে। যে দেশে একটি বিশেষ সম্প্রদায় এভাবে ভীত এবং অনিরাপদ থাকবে, সেই দেশে গণতন্ত্র কিংবা সুশাসনের কথা বলা কেবল মুখের কথা ছাড়া আর কিছুই নয়।
