১৭ মাসে মাজারে ৯৭ হামলা, ৬১% ধর্মীয় মতবিরোধে

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , ডোনেট বাংলাদেশ

সারাদেশে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৭ মাসে অন্তত ৯৭টি মাজার ও সম্পর্কিত স্থাপনা যেমন দরগাহ ও খানকায় হামলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১৩৪টি মাজারে হামলার খবর পাওয়া গেলেও অনুসন্ধানে ৩৭টির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এসব হামলার দুই-তৃতীয়াংশই ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে কুমিল্লায় ১৭, নরসিংদীতে ১০ ও ঢাকায় ৯টি। এসব হামলার ঘটনায় অন্তত তিনজন নিহত এবং ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের’ এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ৯৭টি ঘটনার মধ্যে ৫৯টিতে (৬১ শতাংশ) ধর্মীয় মতবিরোধের কারণে হামলা করা হয়। ২১টি হামলা হয়েছে স্থানীয় মতবিরোধের কারণে, যা মোট ঘটনার ২১ শতাংশ। রাজনৈতিক কারণে হামলা হয়েছে ১৬টি (১৭ শতাংশ)। মাজার কমিটির অন্তর্দ্বন্দ্ব বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের ফলে হামলা হয়েছে একটি। হামলার কারণে পার্থক্য থাকলেও প্রায় সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বে ছিল কথিত তৌহিদি জনতা। আজ সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবে মাকাম। প্রতিষ্ঠানটির সমন্বয়ক মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘটনাগুলো এ প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। দেশের সব হামলা প্রতিবেদনে যুক্ত হয়েছে– এমন দাবি আমরা করছি না। তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি সব হামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে, যাচাই-বাছাই করতে এবং নির্দিষ্ট ফরম্যাটে প্রকাশ করতে। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। ফেসবুক থেকে হামলার ভিডিও সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেসব হামলার বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি এবং ঘটনা তুলনামূলক ভয়াবহ ও সন্দেহমূলক ছিল; সেসব ক্ষেত্রে অনুসন্ধান করা হয়েছে মাঠ পর্যায়ে। প্রমাণ না হওয়া ৩৭টি ঘটনার মধ্যে ছয়টিকে গুজব হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। সারাদেশে সংঘটিত ৯৭ হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১টি। হামলার প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সক্রিয়তা পাওয়া গেছে মাত্র ১১ শতাংশ ঘটনায়। মাকামের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাজারে হামলার ২৬টি ঘটনায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ চিহ্নিত করা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অন্তত ১৩টি হামলায়, জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অন্তত চারটি হামলায়, বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অন্তত পাঁচটি হামলায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অন্তত দুটি হামলায় এবং অন্তত একটি করে হামলায় এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের স্থানীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের অংশগ্রহণের অভিযোগ ও তথ্য পাওয়া গেছে। বিভাগীয় পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগের ৩৬ হামলায় দুজন নিহত ও ১৮০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ময়মনসিংহ বিভাগে আট হামলায় একজন নিহত ও ১৫৩ জন আহত হন। চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮ হামলায় আহত ৩১, সিলেটে ৯ হামলায় আহত ৪৪, বরিশালে দুই হামলায় আহত ৩৭, খুলনায় পাঁচ হামলায় আহত হন ২৩ জনের বেশি। রাজশাহীর ছয় ও রংপুরে তিনটি হামলায় আহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, হামলার শিকার ৯৭টি মাজারের মধ্যে অন্তত ৪৪টি পরিত্যক্ত অবস্থায় এবং বার্ষিক ওরস বন্ধ রয়েছে। ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্তত ২৩টি ঘটনায় ‘নারায়ে তাকবির/লিল্লাহি তাকবির/আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। মাজারে হামলার সময় সংশ্লিষ্ট অন্তত সাতটি মসজিদেও হামলা করা হয়। ১০টি হামলার আগে মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলাকারীরা সংগঠিত হয়েছে। অন্তত ছয়টি মাজারে বুলডোজার/এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মাকাম জানায়, মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোয় হামলার প্রধান কারণ ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ। মাজারকে ‘শিরক-বিদাত’ আখ্যা দিয়ে হামলার পটভূমি তৈরি ও বৈধতা উৎপাদন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা (আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা), সামাজিক অসন্তোষ (মাদক সেবন বা অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ) এবং জমি-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। যেমন কুমিল্লা ও নোয়াখালীর ঘটনাগুলোয় ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে সংগঠিত হামলায় ওরস, মেলা বা সুফি সমাজের অনুষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় যুবকদের চারিত্রিক স্খলনের কারণ হিসেবে অভিযোগের মাধ্যমে ন্যায্যতা দেওয়া হয়। এর প্রভাবে মাজারগুলোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন ওরস, মেলা, মিলাদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।