জীন ছাড়ানোর নামে লন্ডনে নারী-শিশু ধর্ষণের ২১টি ঘটনায় বাংলাদেশি ইমামের যাবজ্জীবন
ইস্ট লন্ডনের মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরে ‘সম্মানিত মুরুব্বি’ হিসেবে পরিচিত একটি মসজিদের ইমাম আব্দুল হালিম খানকে (৫৪) নারী ও শিশুদের ওপর ধারাবাহিক এবং ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন লন্ডনের স্নেয়ারসব্রুক ক্রাউন আদালত। আদালতের রায় অনুযায়ী, তাকে কমপক্ষে ২০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। গত ১১ বছরে, অর্থাৎ ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে, অন্তত ৭ জন ভুক্তভোগীর ওপর এই পৈশাচিক নিপীড়ন চালানোর অপরাধে তাকে এই সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাকে মোট ২১টি পৃথক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে। এর মধ্যে রয়েছে ৯টি ধর্ষণের অভিযোগ, চারটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুর ওপর দুটি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, একই বয়সী শিশুকে পাঁচবার ধর্ষণের অভিযোগ এবং একটি পেনিট্রেশনের মাধ্যমে শারীরিক নিপীড়নের অভিযোগ। আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ প্রমাণ করেছে, হালিম খান ইমামের পদ ও ধর্মীয় প্রভাবকে সুকৌশলে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশি মুসলিম সমাজের নারী ও শিশুদের টার্গেট করতেন। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ভুক্তভোগীদের বেছে নিতেন, যারা লোকলজ্জা বা ধর্মীয় কারণে সহজে মুখ খুলবেন না। তিনি এটাও ভালো করে জানতেন যে, অভিযোগ উঠলেও সমাজ একজন ‘সম্মানিত ইমামের’ কথাই বিশ্বাস করবে, ভুক্তভোগীর কথা নয়। তার অপরাধের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত ও ভয়াবহ। তিনি ভুক্তভোগীদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতেন যে তাদের ওপর বদ জীনের আছর পড়েছে। এরপর সেই ‘অসুখ’ সারানোর নামে তাদের নির্জন ফ্ল্যাট বা গাড়িতে নিয়ে যেতেন। সেখানে নিজের ওপর ‘জীন’ ভর করার অভিনয় করে তাদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালাতেন। মামলার শুনানিতে উঠে আসে শিউরে ওঠার মতো সব বিবরণ। ‘আরিয়া’ ছদ্মনামে পরিচিত এক ভুক্তভোগী জানান, নির্যাতনের সময় হালিম খান তাকে চোখ বন্ধ রাখতে বলতেন। গাড়ির জানালায় টোকা মারার শব্দ সৃষ্টি করে বিশ্বাস করাতেন যে বাইরে অশুভ শক্তি ঘুরছে। মাত্র ১৩ বছর বয়সী আরিয়া তখন আতঙ্কে সবকিছু সহ্য করতে বাধ্য হতেন। আরেক কিশোরীকে সরাসরি ভয় দেখানো হয়েছিল এই বলে যে, মুখ খুললে ‘কালো জাদুর’ প্রভাবে তার পুরো পরিবার মারা পড়বে। সাজা ঘোষণার সময় বিচারক লেসলি কাথবার্ট বলেন, হালিম খান নিজের পাশবিক লালসা চরিতার্থ করার জন্য ক্ষমতার পদ্ধতিগত অপব্যবহার করেছেন এবং এমনভাবে আচরণ করতেন যেন তিনি আইনের ঊর্ধ্বে। বিচারক আরও স্পষ্ট করে বলেন, অভিযুক্ত সচেতনভাবেই দুর্বল ও নির্ভরশীল ব্যক্তিদের শিকারে পরিণত করেছেন। চিফ প্রসিকিউটর সারাহ মরিস কেসি বলেন, হালিম খান ভুক্তভোগীদের ওপর এমন ক্ষত সৃষ্টি করেছেন যা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো, তিনি ভুক্তভোগীদের ধর্মবিশ্বাসকেই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছেন। আদালতে ‘ফারাহ’ ছদ্মনামে পরিচিত এক ভুক্তভোগীর জবানবন্দি উপস্থিত সবাইকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। তিনি জানান, নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানানোর পর তার মা-বাবা তাকে বিশ্বাস না করে উল্টো তাকেই দোষারোপ করেন। ফলে কিশোরী বয়সেই তাকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। তিনি বলেন, যাদের কাছ থেকে নিরাপত্তার আশা করেছিলেন, তারাই তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এই যন্ত্রণা তাকে আজও নিজের পরিচয় নিয়ে সংশয়ে রাখে। ভুক্তভোগীদের একজন হালিম খানকে ‘শয়তানের প্রতিমূর্তি’ বলে আখ্যা দেন। তার মতে, ধর্মীয় লেবাস পরে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা সাধারণ অপরাধের চেয়েও অনেক বেশি জঘন্য। তদন্তকারী দলের পক্ষে মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা জেনি রোনান বলেন, হালিম খান বাইরে নিজেকে সদাচারী ও নির্ভরযোগ্য মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতেন, অথচ আড়ালে তিনি ছিলেন এক ভয়ংকর অপরাধী। তিনি ভুক্তভোগীদের সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, তাদের এগিয়ে আসার কারণেই এই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাজ্যে শিশু সুরক্ষায় কাজ করা দাতব্য সংস্থা এনএসপিসিসি এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে। সংস্থার মুখপাত্র বলেন, সমাজে বিশ্বাস ও আস্থার অবস্থানে থেকে শিশুদের ওপর এই নিপীড়ন সম্পূর্ণ ক্ষমার অযোগ্য এবং এই রায় ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
