১৩ লাখ টাকা দিলে পরীক্ষা ও পাস করা ছাড়াই জাতীয় জাদুঘরে চাকরির নিশ্চয়তা!
ঘুষের বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর-এর এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৩ লাখ টাকা দিলেই চাকরি নিশ্চিত করা হবে, নিয়োগ পরীক্ষাও দিতে হবে না—এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে চাকরিপ্রত্যাশীদের। এ সংক্রান্ত একটি ফোনালাপের রেকর্ড ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যেখানে জাদুঘরের কর্মচারী মো. সুমন মিয়াকে এক চাকরিপ্রত্যাশীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়। সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরের ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের বিভিন্ন পদে মোট ৪৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে প্রক্সি পরীক্ষার ব্যবস্থা, খাতা পরিবর্তন, পরীক্ষার হলে উত্তরপত্র সরবরাহ এবং আত্মীয়স্বজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষায় জালিয়াতির বিষয়ও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে—টাকার বিনিময়ে চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়ার বিষয়টি। কল রেকর্ড অনুযায়ী, কথোপকথনের শুরুতেই অপর প্রান্তের ব্যক্তি সুমনকে ‘সুমন ভাই’ সম্বোধন করে চাকরির “রেট” সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে সুমন বলেন, ‘বাজারদর অনুযায়ী রেট হলো ১৩ (১৩ লাখ)।’ এরপর দর কমানোর অনুরোধ জানানো হলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, এই পরিমাণ কমানো সম্ভব নয়—এমনকি সামান্য পরিমাণও নয়। তখন অপর প্রান্তের ব্যক্তি কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘টেলিফোন অপারেটর আটকায় রাখছেন, আবার ওদিক দিয়ে বলতেছেন! কোন দিকে যামু?’ এই পর্যায়ে সুমন নিজেকে পুরো প্রক্রিয়ার একজন “মাধ্যম” হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, তার কাজ কেবল টাকাটি যথাস্থানে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া, যাতে কোনো ধরনের “ক্যাচিং” বা জটিলতা তৈরি না হয়। একই সঙ্গে তিনি চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন, এই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষায় পাস করার কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ প্রার্থীকে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে চিন্তিত হওয়ার দরকার হবে না। কথোপকথনের একপর্যায়ে সুমন আরও জানান, একই ধরনের ব্যবস্থায় “কবির” নামের এক ব্যক্তির মেয়ের চাকরির বিষয়েও আলোচনা চলছে। এতে বোঝা যায়, এ ধরনের লেনদেন একাধিক ক্ষেত্রে চলমান থাকতে পারে। পরবর্তীতে অপর প্রান্তের ব্যক্তি শতভাগ নিশ্চয়তা পেতে আবারও প্রশ্ন করেন—পরীক্ষায় পাস করা বাধ্যতামূলক কি না। জবাবে সুমন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘টোটাল প্যাকেজ। টোটাল প্যাকেজ। তোমার চিন্তা করার দরকার নাই, কী করা লাগবে, না লাগবে তোমার জানার দরকার নাই।’ এদিকে, এ সংক্রান্ত অডিও রেকর্ড নিয়ে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে সুমন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিনি এমন কিছু বলেননি এবং তার পক্ষে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব নয়। যখন তাকে জানানো হয় যে ফোনালাপের রেকর্ড সংরক্ষিত আছে, তখনও তিনি অস্বীকারে অনড় থাকেন। এমনকি এ বিষয়ে সরাসরি দেখা করে প্রমাণ উপস্থাপনের কথা বলা হলে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে প্রমাণ দেব কেন।’ অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সুমন মিয়ার পরিবারের সদস্যের নিয়োগ। জানা গেছে, তার বোন তাসলিমা আক্তারও জাতীয় জাদুঘরে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তার অনলাইন আবেদনপত্রে সুমনের ইমেইল ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তাসলিমার নিয়োগ নিয়েও প্রক্সি পরীক্ষার অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত পদের বাইরে অন্যভাবে পদায়ন করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা-এ বদলি করা হয়—যা তার পারিবারিক পরিচয় গোপন রাখার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের তীর উঠেছে জাদুঘরের মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ সচিব মো. সাদেকুল ইসলাম-এর দিকেও। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং বিনিময়ে পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন সাদেকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নিয়োগের জন্য সাত সদস্যের নিয়োগ কমিটি আছে। তারাই এ সংক্রান্ত বিষয় দেখে। আর্থিক লেনদেনের খবর অসত্য।’ পুরো ঘটনায় জাতীয় জাদুঘরের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
