বাঙালীর দ্রোহের ভাষা, প্রতিবাদী হুঙ্কার, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর শিষ্টাচারের কি কুৎসিত অবনতি!

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ৯:২২ অপরাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , ডোনেট বাংলাদেশ

একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে ভাষার বিবর্তন এক অভাবনীয় ও কদর্য মোড় নিয়েছে। অভিধানের পুরনো মার্জিত শব্দগুলোর অনেকটাই আজ জাদুঘরের সামগ্রী; আমাদের চারপাশে এখন এক নতুন ভাষা— এর একটা রূপ ‘ইনকিলাবি ভাষা’। আর এই ভাষার আঁতুড়ঘর হলো তথাকথিত ‘জেন-জি’। ফ্যাসিস্ট-ইউনূসের শাসনামলে এই ইনকিলাবি সংস্কৃতির যে বিকাশ আমরা দেখেছি, তা কেবল আমাদের রাজনৈতিক পতন নয়, বরং রুচি ও ভাষারও এক মহাধস। ইনকিলাবি এই ব্যাকরণের মূল স্তম্ভ প্রধানত দুটি শব্দ— ‘শাউয়ামাউয়া’ ও ‘খানকির পোলা’। তাদের ডিকশনারিতে ‘খানকির পোলা’ কোনো সাধারণ গালি নয়, এটি একটি জঘন্য বিশেষ্য (Noun), যা দিয়ে তারা যে-কোনো মানুষকে মুহূর্তেই সংজ্ঞায়িত করে ফেলে। আর যখনই কোনো যুক্তি কাজ করে না, তখন তারা ব্যবহার করে ‘শাউয়ামাউয়া’ নামক এক গোলমেলে সর্বনাম (Pronoun)। ইনকিলাবিদের অমর বাণী ছিল— “এই খানকির পোলাগো শাউয়ামাউয়া ছিইড়া ফেলতে হবে!” মজার ব্যাপার হলো, এই চরম অসভ্য ডায়লগটির ঠিক পরেই তারা চিৎকার দিয়ে বলতেন— “ইনকিলাব জিন্দাবাদ!” যেন নারীকে ইঙ্গিত করে জঘন্য গালি না দিলে ইনকিলাবটা ঠিক ‘জিন্দাবাদ’ হয় না। বাস্তবতা হলো, যখন কোনো ভাষায় গালি আর স্লোগান এভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন সেই ইনকিলাব আর ‘জিন্দাবাদ’ থাকে না, সেটা হয়ে যায় ‘মুর্দাবাদ’। হয়েছেও তাই। ফ্যাসিস্ট-ইউনূসের বিদায়ের পর ইনকিলাব এখন আক্ষরিক অর্থেই মুর্দাবাদ। এরা একসময় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান তুলে যাবতীয় গালি, মব-ভায়োলেন্স আর অসভ্যতা জায়েজ করতো। ইউনূস আমলে প্রতিটি হামলার সময় এই স্লোগানটি ব্যবহৃত হতো একটা ‘লাইসেন্স’ হিসেবে। তৎকালীন সরকার এটাকে দিয়ে গেছে প্রশ্রয়। ফলে অতি নোংরা ভাষাও পৌঁছে গেছে মানুষের ঘরে ঘরে, এবং এর প্রচারের দায়িত্বও প্রায় নিয়ে বসেছিল কিছু গণমাধ্যম। এদের নতুন ব্যাকরণের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। আপনি যদি ‘ইনকিলাব’ নামক এই জীবনদর্শন গ্রহণ করেন, তবে বাই-ওয়ান-গেট-টু অফারের মতো ‘শাউয়ামাউয়া’ আর ‘খানকির পোলা’— এই দুটো উপাধিও আপনাকে অবধারিতভাবে গ্রহণ করতে হবে। এটি এমন এক সংস্কৃতি, যা মানুষকে সুস্থ সমাজ থেকে সরিয়ে এক অন্ধকার নর্দমায় আটকে দেয়। এই ইনকিলাবি বৃত্তে যারা বন্দি, তারা বুঝতেই পারছে না যে এই নোংরা শব্দগুলো ব্যবহার করতে করতে তারা নিজেরাই একেকটি জীবন্ত ‘বিশেষ্য’ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, আপনি যখন এই নর্দমার ভাষাকে বরণ করছেন, তখন ব্যাকরণগতভাবে আপনি নিজেই একটি ‘খানকির পোলা’ হিসেবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করছেন। খেয়াল করলে দেখবেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানধারী যারা, তাদের কেউ ঘুণাক্ষরেও গালির প্রতিবাদ করতো না। বরং এটাকে তারা হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে, অনুশীলন করে গেছে। এত অসভ্য, এত বর্বর ছিল এরা। ইউনূসের দুর্বৃত্তায়নের কালে ইনকিলাবিদের দৌরাত্ম্য আমরা বুকে পাথর বেঁধে সয়ে গেছি। ‘আইয়ামে ইউনূসিয়াতের’ কারণে আমাদের প্রতিবাদী ভাষাটুকু বাতাসে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসেছে বারবার। তবে ফ্যাসিস্ট-ইউনূসের বিদায়ে এখন আমরা মধ্যযুগীয় বর্বরতা থেকে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখছি। সেই স্বপ্ন পূরণে সম্প্রতি একটি বড় আওয়াজ তুলেছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। মন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইনকিলাব মঞ্চ ও আজাদির মতো শব্দগুলোর সাথে বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই; এগুলো মূলত তাদের ভাষা যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। মন্ত্রীর এই রক্তক্ষরণ অত্যন্ত স্বাভাবিক। তিনি দেশপ্রেমিক বাঙালির হৃদয়ের ভাষা পড়তে পেরেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, একদল পাণ্ডা ‘ইনকিলাব’ নাম দিয়ে আমাদের রুচি আর ভাষাকে নর্দমায় নামিয়ে এনেছে। একে আর যাই হোক ‘বিপ্লব’ বলা চলে না। যারা সংস্কারের নাম নিয়ে গালি আর মব দিয়ে দেশ বদলাতে চেয়েছিল, তাদের সেই পচে যাওয়া ইনকিলাবি-ব্যাকরণকে বিদায় জানিয়ে এখন সময় এসেছে সুস্থ রুচির বাংলাদেশে ফেরার।