উগ্রপন্থীদের অবাধ সুযোগ ও সংখ্যালঘুদের ঝুঁকি: বাংলাদেশে ইইউ রাষ্ট্রদূতকে ঘিরে প্রশ্ন
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের ভূমিকা ও বক্তব্য নিয়ে ক্রমেই প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সংখ্যালঘু প্ল্যাটফর্মগুলোর অভিযোগ, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগগুলোর প্রতি ইইউ রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্য সমর্থন কার্যত উগ্রপন্থীদের উৎসাহিত করছে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। গত বছরের অক্টোবরে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের আগে ‘জুলাই জাতীয় চার্টার’ ঘোষণা করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার একে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও সংস্কারের পথে একটি “মাইলফলক” হিসেবে অভিহিত করেন। ইউনূস সরকার রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে প্রচার করে। তবে এই চার্টার নিয়ে দেশজুড়ে শুরু থেকেই বিতর্ক দেখা দেয়। সরকার পরিবর্তনের অন্যতম অংশীজন ইউনিভার্সিটি টিচার্স নেটওয়ার্ক (ইউটিএন) এক বিবৃতিতে জানায়, রাজনৈতিক দলগুলোর সীমিত মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত এই চার্টার জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি করছে। সংগঠনটি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ইউনূসের বক্তব্যকে ‘ফাঁপা ও আপত্তিকর’ বলেও উল্লেখ করে। এদিকে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কোনো প্রতিনিধি সংস্কার কমিশনগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে জানায়, জুলাই চার্টারে শ্রম অধিকার, শিক্ষা, নারী অধিকার ও অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ইইউ রাষ্ট্রদূতের নিঃশর্ত সমর্থন ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’ সংজ্ঞা বদলের অভিযোগ ইইউ প্রধান নির্বাচন পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে ইইউ পর্যবেক্ষক মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রধান বিরোধী দলের বয়কটের কারণে ভোটাররা বিকল্প প্রার্থীর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ পছন্দের সুযোগ পাননি। তবে আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অন্তত অর্ধেক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে সংলাপের বাইরে রাখার পরও ইইউ প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইয়াবস নতুনভাবে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’-এর সংজ্ঞা দেন। তিনি বলেন, “অন্তর্ভুক্তি বলতে আমরা সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণ বুঝি—নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আঞ্চলিক জনগোষ্ঠী।” স্থানীয় সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ উপেক্ষা করে অন্তর্ভুক্তির এই নতুন ব্যাখ্যা কার্যত ক্ষমতাসীন প্রশাসনের বয়ানকে বৈধতা দিচ্ছে। সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নীরবতা চলতি বছরের আগস্টে প্রথোম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের পর ইইউ রাষ্ট্রদূত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এটিকে “গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ” বলে মন্তব্য করেন। তবে একই রাতে দুটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিনি নীরব থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে বিভিন্ন সময় সাংবাদিক গ্রেপ্তার, মামলা ও গণহারে হয়রানির ঘটনাতেও ইইউ বা মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশনের (এমএফসি) পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো অবস্থান দেখা যায়নি। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৬৯ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু ও নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরে বলেছে, ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত না হলে সংখ্যালঘুদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইইউ পর্যবেক্ষকদের ‘দেশজুড়ে ইতিবাচক পরিবেশ ও উৎসাহ’ সংক্রান্ত বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামপন্থী গোষ্ঠী আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে সক্রিয়ভাবে সংগঠিত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগ স্থগিতসহ একাধিক সিদ্ধান্তে এসব গোষ্ঠীর চাপের প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইইউসহ পশ্চিমা কূটনীতিকদের নীরবতা ও প্রশাসনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন উগ্রপন্থীদের আরও উৎসাহিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী চরিত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনগুলো নিখুঁত না হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে নির্বাচন প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, সেটিও গণতান্ত্রিক চর্চার পূর্ণ প্রতিফলন নয়। বরং প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে নিষিদ্ধ রেখে এবং বিরোধী কণ্ঠকে দমন করে আয়োজিত এই নির্বাচন দেশের স্থিতিশীলতার বদলে বিভাজন আরও গভীর করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ইইউ রাষ্ট্রদূত ও পর্যবেক্ষক মিশনের ভূমিকা শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষতার ধারণাকেও দুর্বল করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকর
