নরসিংদীর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত জামায়াত কর্মীকে বাঁচাতে মিমাংসা করেন বিএনপি নেতা
নরসিংদীর মাধবদীতে কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর বিচার চাওয়ায় পিতার সামনে থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারদের একজন জামায়াতে ইসলামীর কর্মী বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আর এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাকে আপোস মিমাংসার নামে ভুক্তভোগীর পরিবারকে এলাকাছাড়া করার হুমকি দেন স্থানীয় এক বিএনপি নেতা। এলাকাবাসীর বরাতে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় মিলেছে। এ ঘটনায় জড়িত মহিষাশুড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানকে ইতিমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে দল থেকে। তাকে এবং তার ছেলেসহ জড়িত ৫ জনকে হত্যার ঘটনার রাতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহত কিশোরীর (১৫) বাড়ি বরিশালে। মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বাবা-মার সঙ্গে সে থাকত। তার বাবা ও ভাই স্থানীয় একটি টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক। এলাকাবাসীরা জানান, ধর্ষণ ও হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত ছিল নুর মোহাম্মদ নুরা। তার সহযোগী ছিল ৩ জন। এর মধ্য এবাদুল্লাহ জামায়াতে ইসলামীর কর্মী। এবারের সংসদ নির্বাচনে এবাদুল্লাহ সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। ভুক্তভোগী পরিবারটির অভিযোগ, ধর্ষণের ১৫ দিন পর্যন্ত মামলা করতে দেয়নি স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। মামলা করতে চাইলে মিমাংসার নামে সময়ক্ষেপণ করে প্রভাবশালীরা। যাতে আলামত নষ্ট হয়। ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় সালিসে। এ সময় ৮ হাজার টাকা সালিস কমিটি ও পুলিশকে দেয় আসামিরা। প্রতিদিনই হত্যার হুমকি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারটির। সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা না হওয়ায় বিপদে আছেন বলে জানান তারা। পরিবারের অভিযোগ, সাবেক ওই ইউপি সদস্য বিচার না করে উল্টো অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা করে অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং কিশোরীর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। বিচার না করায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি, বুধবার রাতে কিশোরীকে তার খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন বাবা। পথে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ৬ তরুণ পথরোধ করে বাবার সামনে থেকেই তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। রাতভর খোঁজাখুঁজির পর গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার একটি সরিষা খেতে কিশোরীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা। তার গলায় ওড়না প্যাঁচানো ছিল। পরে পুলিশ কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে স্থানীয় মেম্বার ও বিএনপি নেতাসহ ৯ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ইউনিয়ন বিএনপি নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলীকে কেন আসামি করা হলো, সে কারণে বাদির বাড়ি ঘেরাও করে তার স্বজনেরা। তাদের দাবি, এলাকার সম্মানের কথা চিন্তা করে মিমাংসা করেছেন মোহাম্মদ আলী। মামলার পরে পুলিশ দ্রুত অভিযানে নামে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে এজাহার নামীয় ৫ আসামিকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন— সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), আহম্মদ আলীর ছেলে ইমরান দেওয়ান (৩২), মো. এবাদুল্লাহ (৩৫), আইয়ুব আলী (৩০) ও মো. গাফফার (৩৭)। মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন জানান, নিহতের মা ৯ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। ৫ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামি নূরাকে গ্রেপ্তারে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল হোসেন জানান, আসামিরা জবানবন্দিতে সালিসে মিমাংসার ভিত্তিতে টাকা দিয়েছে বলে স্বীকার করেছে। নির্বাচনের কারণে ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কাজ করার সময় পাননি বলে জানান তিনি। এদিকে নরসিংদীর পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ্ আল ফারুক জানান, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি হত্যা ও ধর্ষণে জড়িত ৪ জন।
