বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে টিটিপি-আইএসআইএস-কে’র গোপন নেটওয়ার্ক! পেশোয়ার থেকে সতর্কতা!
পাকিস্তানের পেশোয়ার থেকে একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা চিত্রে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল সম্প্রতি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আইএসআইএস-কে’র জঙ্গি নেটওয়ার্কের সম্ভাবনাও। পেশোয়ারস্থিত খ্যাতনামা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক জাওয়াদ ইউসুফজাই তার এক্স হ্যান্ডেলে প্রকাশিত তথ্যে দাবি করেছেন, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে টিটিপি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (বিএএএফ) সদস্যদের নিয়োগের লক্ষ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভারতের পূর্ব সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত বিমানঘাঁটিগুলোকে টার্গেট করা হয় বলে তিনি জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক সূত্র অনুসারে, চট্টগ্রাম ও যশোরসহ একাধিক বিমানঘাঁটিতে অভিযান চালানো হয়। এখন পর্যন্ত ১০ জনের বেশি এয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দুজন ওয়ারেন্ট অফিসার রয়েছেন। ইমামের মাধ্যমে নিয়োগ ও তথ্য পাচারের অভিযোগ জাওয়াদ ইউসুফজাইয়ের প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো— একজন ইমাম, যিনি বিমানঘাঁটির সাথে যুক্ত, টিটিপির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আর্থিক প্রলোভন এবং আদর্শিক প্রচারণার মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ এয়ারম্যানদের টিটিপির সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করেন এই ইমাম। তদন্তকারীদের দাবি, কয়েকজন সদস্য রাডার সিস্টেম এবং যুদ্ধবিমানের অপারেশন-সংক্রান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর তথ্য টিটিপির কাছে পাঠিয়েছেন বলে সন্দেহ রয়েছে। তদন্তের খবর প্রকাশ্যে আসার পর ১০ থেকে ১২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনা ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চল— মিজোরাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। টিটিপির অস্বীকৃতি ও কর্তৃপক্ষের সতর্কতা টিটিপি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে তাদের কোনো উপস্থিতি বা বিমানবাহিনীর সাথে যোগাযোগের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জাতীয় সংসদ, সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানসহ “অত্যন্ত স্পর্শকাতর” স্থাপনাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আঞ্চলিক সংযোগ ১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের পর দক্ষিণ এশিয়ায় ফিরে আসা যোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা এবং ১৯৯০-এর দশকে হুজি-বি’র উত্থান এই অঞ্চলে জঙ্গি নেটওয়ার্কের ভিত্তি তৈরি করেছিল। যদিও পরবর্তীকালে অনেক নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়েছে, তবু তাদের কিছু অবশেষ এখনও সক্রিয় রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। জাওয়াদ ইউসুফজাই জানিয়েছেন, পাকিস্তান-আফগানিস্তান অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ১০০ জন বাংলাদেশি টিটিপির সাথে যুক্ত রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটকে কাজে লাগিয়ে যুবকদের নিয়োগের চেষ্টা চলছে। কয়েকজন রোহিঙ্গাকে টিটিপির সাথে যুক্ত সন্দেহে আটক করা হয়েছে, যদিও রোহিঙ্গা কমিউনিটি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ২০২৫ সালে টিটিপির সাথে লড়াইয়ে গোপালগঞ্জের রতন ধালী (হিন্দু যুবক), ফয়সাল হোসেন, আহমেদ জুবায়ের ও জুবায়ের আহমেদসহ কয়েকজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। মালয়েশিয়ায়ও চরমপন্থী যোগসূত্রে ৩৬ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইএসআইএস-কে (ISIS-K বা ISKP) ISIS-K’র আদর্শিক ছায়া বিমান বাহিনীতে Islamic State – Khorasan Province (ইসলামিক স্টেট – খোরাসান প্রদেশ) প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে। মূলত পাকিস্তানের তেহরিক-ই-তালিবান (টিটিপি), আফগান তালেবান ও অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন সদস্যদের নিয়ে গঠিত। এই সংগঠনের কার্যক্রম আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় বেশী সক্রিয়। ঐতিহাসিক “খোরাসান” অঞ্চল (আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরান, মধ্য এশিয়ার কিছু অংশ) নিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেই এদের মূল লক্ষ্য। এরা আদর্শগতভাবে সালাফি জিহাদি, আইএস (ISIS)-এর কঠোর ব্যাখ্যা অনুসরণ করে। তালেবানকে “নরম” মনে করে ও তাদের বিরোধিতা করে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে তালেবানের প্রভাব মূলত প্রতীকী হলেও আইএসআইএস-কে (ISIS-K)-এর আদর্শিক প্রভাব অনলাইন র্যাডিক্যালাইজড গ্রুপগুলোতে বেশি সক্রিয়। টিটিপি সম্প্রতি বাংলা ভাষায় প্রচারণা শুরু করেছে। আইএসআইএস-কে আফগানিস্তানকে ঘাঁটি করে আন্তর্জাতিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলা ভাষায়ও প্রচার চালাচ্ছে। বাংলাদেশে ISIS-K-এর সরাসরি সাংগঠনিক উপস্থিতি নেই বলে অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন। তবে, আদর্শিক প্রভাব আছে অনলাইন র্যাডিক্যালাইজড যুবকদের মধ্যে। কিছু বাংলাদেশি ISIS-K বা আইএস-এর সাথে যুক্ত ছিলেন (পাকিস্তান-আফগানিস্তান অঞ্চলে) এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে নিয়োগের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। বাংলাদেশে আলাদা “নিও-জেএমবি” বা আইএস-সংশ্লিষ্ট ছোট ছোট গ্রুপ আছে, কিন্তু ISIS-K-এর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নয়। আইএসআইএস-কে বর্তমানে আইএস-এর সবচেয়ে সক্রিয় ও বিপজ্জনক শাখাগুলোর একটি বলে ধারনা করা হয়। সংগঠনটি আফগানিস্তানে ঘাঁটি করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক হামলা চালাচ্ছে, ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে প্রভাব বাড়াচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা এখনো সীমিত বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ভবিষ্যৎ উদ্বেগের গভীরতা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের প্রধান কেন্দ্র নয়। কিন্তু শরণার্থী জনগোষ্ঠী, দুর্বল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অবাধ ব্যবহার এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিয়োগকেন্দ্র ও ট্রানজিট রুটে পরিণত হতে পারে। এই ঘটনাগুলো দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গোয়েন্দা সহযোগিতা জোরদার, অনলাইন র্যাডিক্যালাইজেশনের তদারকি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। (তথ্যসূত্র: জাওয়াদ ইউসুফজাইয়ের প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সূত্র)
