সংস্কার নয়, ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার ফন্দি ইউনুস গংয়ের : রেহমান সোবহানের বক্তব্য স্বীকারোক্তি নাকি সমালোচনা?
রেহমান সোবহান নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে সংস্কারের নামে দেশবাসীকে যা শোনানো হচ্ছে তার পুরোটাই মিথ্যা বয়ান। লোকটা নিজে সিপিডির চেয়ারমান, ইউনূসের সার্কেলেরই মানুষ, কিন্তু তাকেও স্বীকার করতে হচ্ছে যে এই তথাকথিত সংস্কার কমিশনগুলো আসলে একটা প্রহসন ছাড়া কিছু না। ব্যাপারটা দেখুন, ৩৮টা জটিল সংস্কার প্রস্তাবনা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের কোনো ধারণাই নেই। তারা জানে না এসব প্রস্তাবনায় আসলে কী আছে, কোন পথে দেশটাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু গণভোটে বলা হবে শুধু হ্যাঁ বা না। এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র? মানুষকে অন্ধকারে রেখে তাদের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত চাওয়া হচ্ছে। সোবহান একে সরাসরি বলেছেন একটা গুরুত্বহীন প্রস্তাব। শব্দটা লক্ষ্য করুন, গুরুত্বহীন। অর্থাৎ যার কোনো মূল্য নেই। আরও মজার কথা হলো, বিএনপি-জামায়াত জোটের কেউ দাঁড়িয়ে বলছে না যে এই সংস্কারগুলো কতটা জরুরি এবং জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। কারণটা পরিষ্কার। তারা নিজেরাই জানে এসব প্রস্তাবনা আসলে কী জিনিস। ক্ষমতা দখলের পর যে সরকার গঠিত হয়েছে, তার পেছনে এই জোটের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল। জুলাইয়ের দাঙ্গা সংগঠিত করতে, নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করতে তাদের ভূমিকা ছিল। এখন সংস্কারের নামে যা কিছু করা হচ্ছে, সেটা তাদের স্বার্থেই। তাই তারা চুপচাপ। জনগণকে কিছু বোঝানোর দায় তাদের নেই। সোবহান আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলছেন, সংস্কার হলো একটা চলমান প্রক্রিয়া। এটা কোনো একদিনে বা এক বছরে শেষ হওয়ার মতো বিষয় না। একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার কোনো জনগণের ম্যান্ডেট নেই, তারা মাত্র ১৮ মাসে কীভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন করবে? সংসদ নেই, জনপ্রতিনিধি নেই, সংবিধানিক বৈধতা নেই। তাহলে কীভাবে আইন পাশ হবে? কীভাবে বিতর্ক হবে? কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? এই প্রশ্নগুলো তুললে উত্তর পাওয়া যায় না। আসল সত্য হলো, ইউনূস এবং তার দল জানে যে তাদের কোনো বৈধতা নেই। তারা ক্ষমতায় এসেছে একটা সংগঠিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। জুলাইয়ে যা ঘটেছিল, তাকে গণঅভ্যুত্থান বলে চালিয়ে দেওয়া হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বিদেশি শক্তির অর্থায়ন, জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সেনাবাহিনীর নীরব সমর্থন ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব ছিল না। একটা নির্বাচিত সরকারকে সংবিধান বহির্ভূত উপায়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছিল না। এখন সংস্কারের নামে যা হচ্ছে, সেটা আসলে নিজেদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা। মাহফুজ আলম এবং তার সহযোগীরা ভয় পাচ্ছে যে পরিস্থিতি আগের মতো হয়ে যেতে পারে। সেজন্য তারা চাইছে যে কোনো উপায়ে সংস্কারের একটা বৈধতা তৈরি করতে। সোবহান নিজেই বলেছেন যে ইউনূস সম্ভবত মাহফুজকে খুশি করার জন্য এই গণভোটের আয়োজন করেছেন। এটা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন থেকে নয়, ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক হিসাব থেকে। আলী রীয়াজকে দিয়ে প্রচার চালানো, ব্যাংক কর্মচারীদের পাঠানো, এনজিও কর্মীদের দিয়ে হ্যাঁ ভোটের জন্য মানুষকে রাজি করানো, এসব কি কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ? সরকার নিরপেক্ষ থাকার কথা। কিন্তু এখানে সরকার নিজেই একটা পক্ষ হয়ে প্রচার চালাচ্ছে। এটা স্পষ্ট যে ফলাফল আগে থেকেই ঠিক করা আছে। গণভোট একটা লোক দেখানো ব্যাপার মাত্র। সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু আসল সংস্কার কী সেটা নিয়ে কোনো জনসংলাপ হয়নি। জুলাই জাতীয় সনদ বলে যে জিনিস, সেটা জনগণের কাছে পৌঁছেনি। সাধারণ মানুষ জানে না এতে কী কী সংস্কারের প্রস্তাব আছে। তাদের মতামত নেওয়া হয়নি। তাদের অংশগ্রহণ ছিল না। শুধু কিছু কমিশন বসিয়ে দিয়ে, কিছু লোক নিয়োগ দিয়ে, তারা ঠিক করে দিচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে। এটা কোন ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া? সোবহানের সবচেয়ে কঠিন সমালোচনা হলো এই কথাটা যে, যতক্ষণ না একটা নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করছে এবং জনগণ সেই বাস্তবায়নের মান যাচাই করতে পারছে, ততক্ষণ এসব প্রস্তাবনার কোনো মূল্য নেই। কথাটা একদম সত্য। কাগজে লেখা প্রস্তাবনা দিয়ে কিছু হয় না। বাস্তবায়ন লাগে। আর বাস্তবায়ন করতে পারে শুধু একটা বৈধ সরকার, যার জনগণের সমর্থন আছে। ইউনূসের সরকারের কোনো জনগণের সমর্থন নেই। তারা ক্ষমতায় এসেছে একটা পরিকল্পিত অস্থিরতার মাধ্যমে। দেশব্যাপী সহিংসতা, সরকারি সম্পত্তিতে হামলা, পুলিশ হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, এসব দিয়ে তারা ক্ষমতা দখল করেছে। এখন সেই অবৈধতাকে ঢাকতে সংস্কারের মুখোশ পরেছে। সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হলো, যারা নিজেরাই গণতন্ত্রের বাইরে গিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে, তারা এখন গণতান্ত্রিক সংস্কারের কথা বলছে। যারা সংবিধান লঙ্ঘন করে সরকার উৎখাত করেছে, তারা এখন সাংবিধানিক সংস্কারের কথা বলছে। যারা নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার করেছে, তারা এখন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা বলছে। এটা কেমন বিরোধিতা? রেহমান সোবহানের মতো মানুষকেও বলতে হচ্ছে যে তিনি জানেন না এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে। একজন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, যিনি দেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতি দেখেছেন দশকের পর দশক, তিনিও বুঝতে পারছেন না এই চক্র কীভাবে শেষ হবে। এটাই বাস্তবতা। আসল কথা হলো, ইউনূস এবং তার দল যে সংস্কারের কথা বলছে, সেটা আসলে দেশকে একটা নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনায় জনগণের মতামতের কোনো স্থান নেই। তারা চায় জনগণ শুধু হ্যাঁ বলুক। কেন হ্যাঁ বলছে, কীসের জন্য হ্যাঁ বলছে, সেটা জানার দরকার নেই। এই ধরনের গণভোট কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। জুলাইয়ে যারা রাস্তায় নেমেছিল, তাদের অনেকেই আসলে বুঝতে পারেনি তারা কার স্বার্থে কাজ করছে। তাদের ব্যবহার করা হয়েছে একটা বড় খেলায়। এখন সেই খেলার আসল চেহারা ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। সংস্কারের নামে যা হচ্ছে, তা আসলে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা। ইউনূসের সুদি মহাজনি ব্যবসার সাথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংযোগ ঘটছে। এবং এই সংযোগ দেশের জন্য বিপজ্জনক। সোবহানের এই সমালোচনা আসলে একটা সতর্কবার্তা। তিনি বলছেন, কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। মানে যা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার কোনো ভিত্তি নেই। পুরোটাই একটা মায়াজাল। এই মায়াজালে আটকে গেলে দেশ কোথায় যাবে, সেটা ভাবার বিষয়।
