সব শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে হঠাৎ

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :২২ মে ২০২২, ৮:১৯ পূর্বাহ্ণ
সব শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে হঠাৎ

হঠাৎ করেই বাজারে দাম বেড়েছে সব ধরনের শিক্ষা উপকরণের। বেড়েছে বই ও খাতার মূল উপকরণ কাগজের দাম। বিভিন্ন ধরনের তৈরি খাতার দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিকিৎসাবিদ্যা, প্রকৌশল শিক্ষা ও আইনের বইয়ের দাম। বিভিন্ন বিদেশি লেখকের মূল বই বাজারে এখন মিলছে না। ফটোকপি বইয়ের দাম বেড়েছে গড়ে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলাবাজার আর নীলক্ষেত ঘুরে দেখা যায়, কাগজ, খাতা, পেন্সিল, ব্যবহারিক খাতা, মার্কার, স্কুল ফাইল, অফিস ফাইল, বাচ্চাদের লেখার স্লেট, ক্যালকুলেটর, সাদা বোর্ড, জ্যামিতি বক্স, টালি খাতা, কলম বক্স, স্কেল, পরীক্ষায় ব্যবহূত ক্লিপবোর্ড, কালিসহ সব পণ্যের দাম বেড়েছে।

ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, পাঠ গ্রহণের প্রয়োজনে তাদের বিভিন্ন রেফারেন্স বুক ও নোট ফটোকপি করতে হয়। গত এক মাসে ফটোকপি ব্যয় বেড়েছে। ফটোকপির দোকানদাররা জানিয়েছেন, কালি ও কাগজের দাম বাড়ায় তারাও দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বাংলাবাজারের প্রতিষ্ঠান পুঁথি নিলয়ের স্বত্বাধিকারী শ্যামল পাল জানান, দেড় মাস আগে প্রতি টন নিউজপ্রিন্ট কাগজের দাম ছিল ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা। এখন তা ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে সময়ে সাদা কাগজের মূল্য ছিল প্রতি টন ৭০ থেকে ৭১ হাজার টাকা। এখন তা ৯৬ হাজার টাকার ওপরে কিনতে হচ্ছে। এই দামের প্রভাব বই এবং খাতার ওপরেও পড়ছে।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির এই সহসভাপতি বলেন, কাগজ ছাড়াও পুস্তক প্রকাশনার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সব উপকরণের দাম বেড়েছে। প্লেটের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া লেমিনেশনের দর দুইগুণ, সব ধরনের কেমিক্যালের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।

বাংলাবাজারের একাধিক দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্কুল-কলেজে ব্যবহূত কাগজের দাম গত ১ সপ্তাহে রিমপ্রতি ৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। লিটল কাগজ ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা। আম্বার কাগজ ৩৩০ থেকে ৩৬০ এবং অন্যান্য কাগজ সাইজ ভেদে রিমপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা হয়েছে। একই সঙ্গে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ছাপার কাজে ব্যবহূত কাগজের দাম রিমপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়ে গেছে। ৬১ গ্রাম ডিসি সাইজ ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা, ৭০ গ্রাম ডিসি কাগজ ১৪০০ থেকে ১৪৭০ টাকা। ৮০ গ্রাম ডিসি কাগজ ২১০০ থেকে ২১৮০ টাকা। এ ছাড়া কম্পিউটার প্রিন্টিং কাজে ব্যবহূত কাগজের দাম ডাবল এ ফোর কাগজ ২৪০ থেকে ২৭০ টাকা। বসুন্ধরা কাগজ ২৭০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। ফলে বাঁধাই খাতার দাম বেড়েছে ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা।

শনিবার দুপুরে রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ের একটি স্টেশনারি দোকানে কথা হয় মরিয়ম বেগমের সঙ্গে। তিনি সরকারি চাকরজীবী। অষ্টম শ্রেণি পড়ূয়া মেয়ের খাতা-কলম কিনতে ৫০০ টাকা নিয়ে নীলক্ষেত মোড়ের একটি দোকানে এসেছিলেন ৩০০ পেজের ছয়টি খাতা, ১২০ পেজের পাঁচটি, আর কিছু কলম কিনবেন বলে। কিন্তু দাম বাড়ায় তিনি ৩০০ পেজের পাঁচটি, ১২০ পেজের তিনটি খাতা আর কিছু কলম কেনেন। তিনি বলেন, মেয়ের খাতা-কলম কেনার জন্য এসেছিলাম। আগে ৫০০ টাকার মধ্যে যে পরিমাণ খাতা-কলম পাওয়া যেত এখন সেটা যাচ্ছে না। তাই কম করে নিচ্ছি।

নীলক্ষেতের তাহ্‌সান বুক ডিপোর মালিক আতাহার আলী বলেন, আগে প্রিন্ট করা বইয়ের দাম এখনও ঠিক আছে। কিন্তু নতুন করে আসা সব বইয়ের দাম ২০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল একটি বই প্রিন্ট করে নিয়ে আসছি, যেটা আগে ১৯০ টাকা লাগত সেটা কালকে ২৫০ টাকা নিয়েছে। আগে ফটোকপি ৯৫ পয়সা নিত সেটা এখন ১ টাকা ১০ পয়সা।

নীলক্ষেত মোড়ের শিক্ষা উপকরণের দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, ব্যবহারিক খাতা ৪০ টাকারটা এখন ৫০ টাকা, ৬০ টাকারটা ৭০ টাকা। কলমের দাম ডজনপ্রতি বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। মার্কার পেন প্রতি পিস ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা হয়েছে। সাধারণ ক্যালকুলেটর ৮০ টাকারটা ১২০ টাকা, ৯৯১ এক্স ১৫০০ টাকা থেকে ১৭০০ টাকা, ৯৯১ এক্স প্লাস ১৩৫০ টাকা থেকে ১৬০০ টাকা, ৯৯১ এমএস ৮৫০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা। জ্যামিতি বক্স ৭০ থেকে ৮০ টাকা, ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা। ৩০০ পেজের খাতা ৫০ টাকা থেকে ৬৫ টাকা, ১২০ পেজের খাতা ৩০ টাকা থেকে ৩৫ টাকা, কালার পেপার রিম ৩২০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা। মিনি ফাইল প্রতিটি ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা। জিপার ফাইল ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা। রেজিস্টার খাতা ৩০০ পেজ ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, ৫০০ পেজ ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা। প্লাস্টিক ও স্টিলের স্কেল ডজনপ্রতি ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। রাবার ডজনপ্রতি ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা বেড়েছে।

নীলক্ষেত মোড় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা বই, খাতা, কলম কিনতেন ও ফটোকপি করতেন। সেখানেও দাম বেড়েছে। অ্যাড প্রিন্টিং প্রেসের মালিক রুবেল মিয়া জানান, তার দোকানে শিক্ষার্থীরা ফটোকপি, প্রতিবেদন প্রিন্ট, স্পাইরাল করেন। তিনি ক্যানন জি১০১০ মডেলের যে প্রিন্টার দিয়ে প্রিন্ট করান, সেটার দাম ১৮ হাজার থেকে এখন ৩২ হাজার টাকা। ডিজিটাল প্রিন্টার রিকন্ডিশনটার দাম ১ লাখ ১০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। প্রিন্টারের যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। কালির দাম সেট প্রতি ২৫০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা হয়েছে। আম্বার ও সোনালি কাগজের দাম প্যাকেট প্রতি ২২০ টাকা থেকে ২৯০ টাকা হয়েছে।স্পাইরাল প্লাস্টিকের দাম ২ টাকা থেকে ৫ টাকা হয়েছে। ফলে তাদেরও ফটোকপি, প্রিন্ট, স্পাইরালের দাম বাড়াতে হয়েছে। ফটোকপি ৯৫ পয়সা থেকে ১ টাকা ১০ পয়সা, স্পাইরাল ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা।

ইডেন কলেজের ছাত্রী শামীমা আক্তার কিছু সিট ফটোকপি আর স্পাইরাল করতে নীলক্ষেতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, আগে একটি কোর্সের বইয়ের ফটোকপি আর প্রতিবেদন তৈরি করতে ১০০০ টাকার মতো লাগত। কিন্তু এখন দেড় হাজার টাকার নিচে আর হচ্ছে না।

বাংলাবাজারে গুডলাক ফাইল ৫ টাকা, ব্যবহারিক খাতা ২০ টাকা, ছোট খাতা ১০ টাকা, বাচ্চাদের স্লেট ১০ টাকা, ক্যালকুলেটর সাইজ ভেদে ৩০ থেকে ৪০ টাকা, জ্যামিতি বক্স ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা, কলম বক্স ১০ টাকা, সাদা বোর্ড ফুট ৩৫ টাকা, স্কেল ৫ টাকা, কালি ১০ টাকা, ক্লিপবোর্ড ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা দাম বেড়েছে। হঠাৎ করে এসব পণের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাবাজার সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বলেন, এক সপ্তাহ আগে আমি কৃষিশিক্ষা ব্যবহারিক খাতা কিনেছি ৯০ টাকায়, এখন এটা ১২০ টাকা নিচ্ছে। সাধারণ খাতার দামও বেড়েছে।

কাগজের দাম বাড়ার বিষয়ে বাংলাবাজারের মুকুল পেপার হাউসের ম্যানেজার আলতাফ হোসেন বলেন, দেশে একের পর এক পণ্যের দাম বেড়েছে। যে কারণে কাগজের দাম বেড়েছে। হঠাৎ করে এর আগে কখনও এভাবে দাম বাড়ার নজির নেই।

তিনি আরও বলেন, কাগজের দাম বাড়ার অন্যতম আরেকটি কারণ মিল সিন্ডিকেট। তারা বাজারে সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ায়।

একুশে প্রিন্টার্সের পরিচালক অসিত পাল বলেন, এ বছরের শুরু থেকেই কাগজের দাম বেড়েছে। একই শ্রমিকদের মজুরিও বাড়াতে হয়েছে, যে কারণে বইয়ের দাম একটু বেড়েছে।

বাংলাবাজারের অনন্য প্রকাশনীর পরিচালক মনিরুল হক বলেন, একটা শ্রেণির সিন্ডিকেটের কাছে আমরা বন্দি। তারা যেভাবে চায় আমাদের সেভাবেই চলতে হয়। একের পর এক কাগজের দাম বাড়াতে বইয়ের দাম বাড়াতে হচ্ছে আমাদের। এভাবেই চলছে সবকিছু।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

আরও পড়ুন