শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মরণে হয় একটি শারদীয় দূর্গা উৎসব

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :৭ অক্টোবর ২০২১, ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মরণে হয় একটি শারদীয় দূর্গা উৎসব

পাবনার মধ্যে শহরে গোপালপুর মহল্লার একটি পাড়া ডাক্তার ইসহাক লেন। মুসলিম অধ্যুসিত পাড়াটিতে গুটিকয়েক সনাতন ঘর মিলেমিশে বাস। তিন দশক পূর্বেও এই পাড়ায় কখনও দূর্গা উৎসবে ঢাকের বাদ্য মাতয়ারা হয়েছে বলে জানা নেই কারো।কোনো বয়জষ্ঠে্যও বলতে পারেনা। এর একটি কারন হতে পারে এখন দূর্গোৎসব যে ভাবে সার্বজনীন ও বারোয়াড়ী রূপলাভ করেছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে তেমনটা ছিল না। বনেদি ও ধর্নাঢ্য ব্যক্তিরাই দূর্গা উৎসবের কর্তা ব্যক্তি ছিলেন। পূজার সংখ্যাও ছিল সে কারনে কম। আজ থেকে ৩০ বছর পূর্বে এই এলাকার কয়েক কিশোর-যুবক স্থির করল এই পাড়াতেই শারদীয়া উৎসব হবে । তাদের সাথে এসে যোগ দিলো মুসলিম বন্ধুরাও। স্থির হলো এলাকার কিশোর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পল্টু মহন চৌধুরী সহ শহীদের স্মরণে হবে এই শারদীয়ার অর্ঘ্য নিবেদন।পল্টু ছিলেন ওই মহল্লার প্রফুল্ল কুমার রায়ের ছেলে।দশম শ্রেণি পড়ুয়া এক দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা। পরিবারের কাছে তার কোনো ছবিও নেই। কিন্তু দুঃসাহসী এই যোদ্ধার বীরত্বের কথা এই সকল যুবকেরা শুনেছে পল্টুর সহযোদ্ধাদের মুখে। সিদ্ধান্ত হয় উৎসবের মধ্যে দিয়ে নতুন প্রজন্মের মাঝে তার দেশপ্রেমের গল্প ছড়িয়ে দিতে।
পল্টু ১৯৭১ সালের ১৪ অক্টোবর শহীদ হোন। একটি অপারেশনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ধরা পড়েন রাজাকার বাহিনীর হাতে। সদর উপজেলার কুচিয়ামোরা এলাকায় নৃশংস নির্যাতনে তাকে হত্যা করে রাজাকার-আলবদররা।
এলাকার সন্তানের এই সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের কথা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯২ সাল থেকে এই দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু। শত প্রতিবন্ধকতা আর প্রতিকূলতার মাঝেও দীর্ঘ ৩০ বছরের ধারাবাহিক আয়োজনে ছেদ পড়েনি।পল্টুর স্মরণে দুর্গাপূজার জন্য কোনো নির্ধারিত জায়গা না থাকলেও এলাকাবাসী হিন্দু-মুসলিম সবার স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় মহল্লার যেখানে জায়গা মেলে সেখানেই মণ্ডপ তৈরি করে প্রতিবছর এই আয়োজন করা হয়। কয়েক বছর এলাকার বনেদি সজ্জন মানুষ ইদ্রিস আলি বিশ্বাসের মাঠে এই পূজা মন্ডপ হয়। যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতির এক উজ্বল দৃষ্টান্ত। এই শারদীয়া আয়োজন পাবনা শহরে শৈল্পিক প্রতিমা তৈরী ও স্বাজসজ্জা সকলের নজর কারে। ধর্মীয় আবেগের চেয়ে সার্বজনীনতাই এখানে মূল মন্ত্র।
দেশমাতৃকার বিপদে আকাতরে বিলিয়ে দেওয়া এই শহীদদের রক্ত হিন্দু কি মুসলিমের তা বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য বিষয় দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ। আর এখানকার পূজা আয়োজনে সেটিই প্রাধান্য পেয়েছে। যা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে।পাবনার শহীদ পল্টু ক্লাবের আমন্ত্রণ পত্রে লেখা থাকে ”আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের পঞ্চপ্রদীপ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে অগ্রবর্তী করি-যাতে পৃথিবীর তাবৎ দানবিক..অসুরিক.. জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসী আগ্রাসন শক্তির বিনাশ ঘটে।
আমাদের বিনম্র বাহু মায়ের উদ্দেশে্য উত্তলিত করি প্রার্থনায় নত হই… দু:খকে জয় করার আর জাতীয় সুখ সমৃদ্ধি ও লাখো শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অভিপ্রায়ে।
এ চাওয়া যেন প্রতিটি বাঙালির শারদীয়া উৎসবকে ঘিরে প্রানের চাওয়া।বছর ঘুরে এই সার্বজনীন দূর্গাপূজা এলেই বাঙ্গালী মেতে উঠে এক আনন্দ উৎসবের আমেজে। এই প্রাণবন্ত আমেজ সকল মানুষের মাঝে শান্তির বার্তা বয়ে আনুক।
উৎসারিত হোক, ধর্ম যার যার উৎসব হোক সবার।।
– গোপাল সান্যাল
সাংস্কৃতিক ও নাগরিক আন্দোলন কর্মী, নিউইয়র্ক।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।