রবীন্দ্রমতে বিয়ে, বন্যার গান এবং নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা: হাসানুজ্জামান সাকী

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :৩১ জুলাই ২০২২, ৬:৩৩ অপরাহ্ণ
রবীন্দ্রমতে বিয়ে, বন্যার গান এবং নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা: হাসানুজ্জামান সাকী

নিউইয়র্কে রোববারের সন্ধ্যাটা সারাদিনের ভারী আকাশের মতোই কেমন যেন বিষণ্ন হয়ে উঠলো। মনটা গেল খারাপ হয়ে। হু হু করে উঠলো ভেতরটা। অবশ্য এই মন খারাপ হওয়াটাও এক ধরনের ভালো লাগা।

ঘটনাটা আমার কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। দুই একজনের সাথে শেয়ারও করলাম। আমিই কী ভুল করছি নাকি নিউইয়র্কে এটাই স্বাভাবিক। তাদেরও মোটামুটি একই মত, একই রকম ভালো লাগা, মন খারাপ হওয়া, হু হু করে ওঠা…।

একজন আমার পাশে বসে ছিলেন। না, আমিই গিয়ে পাশে বসলাম। নিউইয়র্কে প্রথম দিককার একজন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। এখন সিটিতে চাকরি করেন। পিএস ওয়ান ওয়ান টু-এর হল ভর্তি মানুষ। এখানে পাবলিক স্কুলকে সংক্ষেপে পিএস বলে আর প্রতিটা স্কুলের একেকটা নম্বর থাকে। এখানকার হলেই রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান শুরু হবে একটু পর। অনুষ্ঠানের শেষ পারফরম্যান্স। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত তিনদিনের বইমেলার বিদায়বেলা।

আমার পাশের মানুষটি বললেন, তাঁর বিয়ে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকালাম। নির্মলদা (নির্মল পাল) হিন্দু হলেও বউদি ব্রাহ্ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম ছিলেন, এটা জানা থাকলেও ব্রাহ্ম সমাজের বিয়ে প্রথা সম্পর্কে জানা ছিল না। জানলাম, হিন্দুরা সংস্কৃততে বিয়ের মন্ত্র পড়ে আর ব্রাহ্মদের বিয়ে হয় বাংলা মন্ত্রে। একটা মন্ত্র এমন— ‘আমার হৃদয় তোমার জন্য, তোমার হৃদয় আমার জন্য, আমাদের দুজনের মিলিত হৃদয় হোক ঈশ্বরের জন্য’।

ব্রাহ্ম সমাজে বিয়েতে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হয়। শান্তা বউদি (ডা. শান্তা পাল) যেহেতু ব্রাহ্ম ছিলেন, তাই নির্মলদাকে প্রথমে ব্রাহ্মমতেই বিয়ে করতে হয়েছিল। ওখানেই বাংলা মন্ত্রে আর রবীন্দ্রনাথের গানে গানে তাদের বিয়ে হয়।

দর্শকসারিতে বসে আমি চিৎকার করে একটি গান গাইতে অনুরোধ করলাম বন্যা আপাকে— ‘একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে… আনন্দ বসন্ত সমাগমে…’। বন্যা আপা শুনতে পেলেন কী পেলেন না জানি না, তবে নির্মলদা এবার অবাকভরে তাকালেন আমার দিকে। আরে এটি তো আমার বিয়ের গান। অর্থাৎ ‘রবীন্দ্রমতে’তাঁর যে বিয়ে হয়েছিল, এতে আরো অনেক গানের সাথে এটিও গীত হয়। ধ্যানে থাকলে নাকি অনেক কিছুই জানা হয়ে যায়। আমরা দুজন আজ ধ্যানেই বসেছি।

ভুলটা একটু পরেই ভাঙলো। আমরাই শুধু ধ্যানে বসিনি। বন্যা আপা গানের ফাঁকে ফাঁকে দর্শক-শ্রোতাদের সাথে কথা বলছিলেন। বললেন, তাকে গানের অনুরোধ করলে নাকি তাঁর সাথে সাথে গাইতে হয়। এ-কী কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ! এসব তো ব্যান্ডের কনসার্টে হয়। একঝাঁক তারুণ্য সমস্বরে গেয়ে ওঠে— ‘আকাশেতে লক্ষ তারা, চাঁদ কিন্তু একটারে…’। কিন্তু ‘আকাশভরা সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণ’—এ কিভাবে গাওয়া সম্ভব একসাথে!!

বন্যা একে একে গাইলেন কয়েকটি গান। না, তাকে গাইতে হলো না। প্রতিটা গানের মুখটা শুধু ধরিয়ে দিলেন, বাকিটা শ্রোতারাই গাইলেন। একেবারে তাল রেখে গাওয়া গান। নিউইয়র্কের শত শত কণ্ঠে হারিয়ে গেলো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই বাংলার প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কণ্ঠ। শিল্পীর চোখেমুখে মুগ্ধতা, মুগ্ধ বোকা বনে যাওয়া আমি।

মনে পড়লো, আজ থেকে দুইযুগ আগে প্রথম বিদেশ বিভুঁইয়ে কলকাতার একটি সিনেমা হলে গিয়ে, ছবি দেখে এমন ভালো লেগেছিল, এমন মন ভরে ওঠেছিল যে, আর একটি দিনও থাকতে পারিনি। রাত পোহাতেই গ্র্যান্ড টাংক রোড ধরে সোজা দেশে এসে পৌঁছেছিলাম। অনেক বছর পর নিউইয়র্কে আবার আমার এমনই ভালো লাগলো, এমনই মন খারাপ হলো…।

পরিশিষ্ট:
আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে নিউইয়র্কে আমার প্রথম বইমেলার অভিজ্ঞতায় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার পরিবেশনা দেখে এই লেখাটি লিখেছিলাম। এবারও বইমেলার দ্বিতীয় দিন বন্যা আপা গেয়েছেন। আজ শেষ দিনে তিনি নেই, তবে অপেক্ষাকৃত তরুণ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সেজুঁতি দে আছেন। আর আছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী নজরুল সংগীত শিল্পী ড. নিরুপমা রহমান।

লেখক-পাঠক-প্রকাশকের বেলাশুরুর আড্ডায় মশগুল হতে, দিনভর বইয়ের সুঘ্রাণ পেতে আর বেলাশেষে রবীন্দ্র-নজরুল দ্বৈরৎ উপভোগ করতে আসুন, আমি আমরাও আসছি…।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।