মায়ের দেয়া কাটা চামচ দিয়ে ট্রেনে ভোজনবিলাস

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :৯ অক্টোবর ২০২১, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ
মায়ের দেয়া কাটা চামচ দিয়ে ট্রেনে ভোজনবিলাস

জার্মানিরা হাত দিয়ে ভাত খাওয়াকে বলে- এসেন মিত মুটার গাবেল। মানে আঙুল বা হাত দিয়ে খাওয়া। মুটার গাবেল মানে মায়ের কাটা চামচ। চেক রিপাবলিক থেকে জার্মানি আসার পথে ট্রেনে এ কাজটি করেছি। হাত দিয়ে চিকেন বিরিয়ানি খেয়েছি।

১ অক্টোবর ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস (ICE) ডিবি মানে ডয়েসে বান বা জার্মান ট্রেনে চেপে বসলাম ফ্রাঙ্কফুর্ট মেইন স্টেশনের চার নম্বর প্লাটফর্ম থেকে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগের উদ্যেশে। ৬০৮ কিলোমিটার দূরত্ব। আমি যে ট্রেনে যাচ্ছিলাম, এটা দ্রুতগতির ট্রেন, ঘণ্টায় তিনশ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে।

বিকেল ১৬:২৭ মিনিটে পৌঁছলাম নুরেনবার্গ স্টেশনে ৮ নম্বর প্লাটফর্মে। সেখান থেকে ১৭ নম্বর প্লাটফর্ম থেকে ১৬:৩৭ মিনিটে ৫২৯১ নম্বর RE মানে রিজিওনাল এক্সপ্রেস বা আন্তজেলা ট্রেনে উঠলাম। নুরেনবার্গের এই ট্রেনে চেক রিপাবলিকের সীমান্ত শহর Cheb-এ পৌঁছলাম সন্ধ্যা ১৮:২২ মিনিটে। চেকের সীমান্তরক্ষী পুলিশ ট্রেনে ঘুরে ফিরে চলে গেল। পরে যাত্রীরা নামলাম। নেমে পাশের প্লাটফর্মে প্রাগগামী ৫৪৫ নম্বর এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠলাম। এই ট্রেন বাংলাদেশের মতো হুইসেল বাজিয়ে ১৮:৩৩ মিনিটে ছুটলো প্রাগের পথে। আমার সামনে যাত্রীর মুখে মাক্স না থাকায়, বললাম প্লিজ মাক্স পড়ুন! সে বললো সে মাদকসেবী, তাই তার মাক্স দরকার পড়ে না। এই বলে বিয়ারের ক্যানে চুমুক দিলো। ২১:২১ মিনিটে প্রাগে পৌঁছলাম। ইউরোপে কোনো সমস্যা না হলে সঠিক সময়ে ট্রেন বা বাস চলাচল করে। প্রায় ৭ ঘণ্টায় প্রাগে পৌঁছা। প্রাগকে জার্মানরা প্রাহা বলে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্য ইউরোপের দেশ চেক রিপাবলিকের বর্তমান রাজধানী শহর।

চেক প্রজাতন্ত্র, সংক্ষিপ্ত নাম দ্বারাও পরিচিত চেকিয়া। আরো আগে বোহেমিয়া নামে পরিচিত ছিল। মধ্য ইউরোপের এই দেশটির দক্ষিণে অস্ট্রিয়া, পশ্চিমে জার্মানি, উত্তর-পূর্বে পোল্যান্ড এবং পূর্বে স্লোভাকিয়া অবস্থিত। জনসংখ্যা ১০৭ মিলিয়ন (২০২০)। এখানের প্রেসিডন্ট মিলো জেমান।

মুদ্রার নাম চেক কোরুনা। বন্ধু মামুন হাসান স্টেশনের বুর্গাকিং সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো । তার গাড়িতে করে তার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান “কারি হাইসে” যাওয়ার পর খাসির কারি দিয়ে নান রুটির আপ্যায়ন আর খোশগল্পে বাজলো রাত ১২টার বেশি। দোকানের কাছাকাছি তার আবাসন।

পরম আত্নীয়তায় মুগ্ধ করলো মামুন হাসান ও তার সহধর্মিণী আর তাদের পরীর মতো লক্ষ্মী মেয়ে মুন। সকালে নাস্তার টেবিলে মজাদার খাবারের পাশাপাশি যে জিনিসটি বেশি ভালো লেগেছে তা হলো নাস্তা খাওয়ার সময় তার সহধর্মিণী খাদিজা সুলতানা মুন্নী জানালার কাছে খোলা আকাশের মুক্ত বিহংগের কবুতরকেও নাস্তা দিল। প্রতিদিনই এই কবুতর আসে খেতে, আবার উড়ে যায় দূরে কোথাও। ঘুঘু পাখিও আসে মাঝে মাঝে। শুধু তাই নয়, পরিপাটি ছবির মতো সাজানো বাসায় মধ্যে টবে লাগিয়েছেন লেবুগাছ, বোম্বাই মরিচ গাছ। তাড়াতাড়ি বের হতে হলো কারণ যে জন্য প্রাগে, তা হলো ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। সবাই মিলে ভিনর ক্রিকেট গ্রাউন্ডে গেলাম। শরতের সোনালি রৌদ্রজ্জল দিনে খেলা চললো প্রাগ টারগারস, হামবুর্গ রয়েলস ও টাইগারস আম মাইনের মধ্যে। সন্ধ্যায় মেট্রো ট্রেনে মামুন হাসান নিয়ে গেল প্রাগের ওল্ড টাউন দেখাতে। মজার ব্যাপার প্রাগে সপ্তাহের সাত দিনই সব দোকানপাট খোলা থাকে। আর এই চত্বরকে চেকের ভাষায় বলে স্টারে মেসতো Stare Mesto.এখানে রয়েছে Astronomical ঘড়ি। এই ঘড়িটি দেখার জন্য প্রতিদিন লাখো দর্শনার্থী ভীড় করে এখানে। এমনকি এই করোনা মহামারির মধ্যেই এখানে মনে হলো না মহামারি আছে। দুই-একজন ছাড়া কারো মুখে মাক্স ছিল না। এই ঘড়িটি ৬শ বছরের পুরনো। অন্যান্য জ্যোতির্বিজ্ঞান ঘড়ির মতো, বিখ্যাত প্রাগের ঘড়িটি কার্যকরভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান তথ্য প্রদর্শন করার জন্য একটি বিশেষভাবে পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। অরলোজের মতো অনেকেই সূর্য, চন্দ্র, রাশি রাশি এবং কখনো কখনো অন্যান্য গ্রহের আপেক্ষিক অবস্থান দেখানোর প্রবণতা দেখান।

প্রাগের জ্যোতির্বিজ্ঞান ঘড়িটি Orloj নামেও পরিচিত, এটি সময় বলে, তারিখ প্রদান করে, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং রাশিচক্রের তথ্য দেখায় এবং সবচেয়ে ভালো। প্রতি ঘণ্টায় তার দর্শকদের জন্য কিছু চমক দেখায়। পর দিন ছিল ক্রিকেটের ফাইনাল, চেকের জাতীয় ক্রিকেট টিমের নিও মি, Teri O Onor ছিলেন প্রধান অতিথি। ফাইনালে ফ্রাঙ্কফুর্ট টিম প্রাগ কে হোয়াইটওয়াশ করে শিরোপা লাভ করে।

এবার ঘরে মানে ফ্রাংকফোর্ট ফেরার পালা। মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড বাকি ছিল ট্রেন ছাড়ার, ১৬:৪৩ মিনিটের ট্রেনে উঠতে পারলাম। আমার পথে খাবারের জন্য মুন্নী ভাবি এক প্যাকেট মুরগির বিরিয়ানি ও পানি দিয়েছিল। খেতে গিয়ে দেখি ভিতরে চামচ নাই খাবার জন্য। অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে পানি দিয়ে হাত ধুয়ে হাত দিয়েই ট্রেনের মধ্যে বিরিয়ানি খেলাম। ভাবলাম যদি হাত দিয়ে অন্য সব খাবার খাওয়া যায় তবে বিরিয়ানি বা ভাত কেন নয়। অন্য রকমের অভিজ্ঞতা হলো। রাত দেড়টায় বাসায় পৌঁছলাম। সেই বাহির থেকেই দরজা খুলে ঘরে ঢুকতে হলো, কেউ খুললো না ভিতর থেকে।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।