ভ্যাকসিন নিয়ে রাজনীতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা, আগাম সমালোচনা

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১৯ জানুয়ারি ২০২১, ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 43 বার
ভ্যাকসিন নিয়ে রাজনীতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা, আগাম সমালোচনা

করোনা ভ্যাকসিনকে রাজনৈতিক ইস্যু করতে চাচ্ছে সরকারবিরোধী কিছু দল। সরকারকে চাপে ফেলতে এসব রাজনৈতিক দল ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগাম সমালোচনা শুরু করেছে। এর মাধ্যমে তারা ভ্যাকসিন নিয়ে রাজনীতি উত্তপ্ত করতে চাচ্ছে। তবে সরকারী দলও ঘরে বসে নেই। বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দিতে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি তারা ভ্যাকসিন নিয়ে দেশের মানুষকে আশঙ্কামুক্ত রাখতে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে দিচ্ছে।

ভ্যাকসিন নিয়ে এখন প্রতিদিনই রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বক্তব্য রাখছেন। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণও হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, করোনা ভ্যাকসিনই যেন এখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু। অভিজ্ঞ মহলের মতে, ভ্যাকসিন একটি জনসম্পৃক্ত বিষয়। তাই এটিকে রাজনৈতিক ইস্যু বানানো কোনভাবেই ঠিক নয়। তবে ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা নিয়ে যদি বিরোধী দলের ভাল কোন প্রস্তাব থাকে তাহলে তারা তা সরকার কিংবা সরকারী দলের সঙ্গে কথা বলতে পারে। কিন্তু তা না করে ভ্যাকসিন নিয়ে জনমনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করা হলে তা হবে অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ।

করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন আমদানি করা হচ্ছে এমন খবর শোনার পর থেকেই বিএনপিসহ কটি বিরোধী দল ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ করে আসছে, সরকার করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন প্রয়োগের বিষয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারবে না। দেশের সব মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে পারবে না বলেও তারা অভিযোগ করছে। আর সরকার ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকার ভ্যাকসিনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে এবং সকল নাগরিকের জন্য তা ব্যবস্থা করবে। এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কোন কারণ নেই।

এদিকে ভ্যাকসিন নিয়ে অনিয়ম হতে পারে আশঙ্কা করে তা পর্যবেক্ষণ করতে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি সিনিয়র নেতাদের দিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি করেছে। এতে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের স্থান দেয়া হয়েছে। এ কমিটি ভ্যাকসিনের বিষয়ে যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। বিএনপি ছাড়া আরও কটি দল নিজ নিজ অবস্থানে থেকে করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। অপরদিকে সরকার এবং সরকারী দল আওয়ামী লীগও এ বিষয়ে বিরোধী দল কি করতে চায় সেদিকে চোখ রাখছে।

দেশে করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনায় লিপ্ত বিএনপিসহ কটি বিরোধী দল। আর সরকারের মন্ত্রী-এমপিসহ আওয়ামী লীগের নেতারা বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দেয়ার পাশাপাশি করোনা মোকাবেলায় সফলতার চিত্র তুলে ধরছেন। প্রায় প্রতিদিনই এ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নিয়ে মিডিয়ার সামনে হাজির হন। এক পর্যায়ে করোনা থেকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলে আসে ভ্যাকসিনে।

উল্লেখ্য, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সারাবিশ্বে গত এক বছরে মারা গেছে ২০ লক্ষাধিক মানুষ। আর আক্রন্ত হয়েছে প্রায় ২০ কোটি মানুষ। চীনের উহান থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলেও চীন সফলভাবেই তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অনেক প্রভাবশালী দেশ এখনও করোনা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সোয়া ৫ লাখ মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত। মারা গেছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার। এ পরিস্থিতিতে করোনা থেকে মুক্তি পেতে ইতোমধ্যেই ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশেও শীঘ্রই ভ্যাকসিন চলে আসবে। ভ্যাকসিনের জন্য ভারতের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। আর এ পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিন ইস্যুতে বিরোধী দল ও সরকারী দলের নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য জমে উঠেছে।

সম্প্রতি ভ্যাকসিন নিয়ে দলীয় বক্তব্য তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। এতে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে করোনার ভ্যাকসিন দেয়ার পাশাপাশি ভ্যাকসিন নিয়ে সরকারের কর্মপরিকল্পনা অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিটি ভ্যাকসিনের মূল্য ৪২৬ টাকা পড়বে। এই মূল্যটা কি সরকার প্রদান করবে নাকি জনগণকে প্রদান করতে হবে; বিষয়টা ক্লিয়ার নয়। অবিলম্বে সরকারের এ বিষয়ে পরিপূর্ণ একটা পরিকল্পনা অর্থাৎ ভ্যাকসিন সংগ্রহ, বিতরণ, মূল্য, কতজনকে দেয়া সম্ভব হবে এর একটা রোডম্যাপ অবশ্যই জনগণের সামনে প্রকাশ করার দাবি জানাচ্ছি। এ ছাড়া আমরা বিনামূল্যে দেশের মানুষকে ভ্যাকসিন প্রদানের দাবি জানাচ্ছি।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা শুনতে পাচ্ছি, উচ্চ পর্যায়ের মানুষের জন্য ইতোমধ্যে ভ্যাকসিন দেয়ার তালিকা প্রস্তুত হয়ে গেছে। খবর পেয়েছি, গুলশান ক্লাব, ঢাকা ক্লাব, উত্তরা ক্লাবগুলোর যারা সদস্য আছেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে। আরও শুনছি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যারা আছেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে, মন্ত্রীদের জন্য করা হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ কিভাবে এই ভ্যাকসিন পাবে, কখন পাবে সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন বক্তব্য আমরা সরকারের কোন দফতরের কাছ থেকে পাইনি।

মির্জা ফখরুল বলেন, ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট যে ভ্যাকসিনটা অক্সফোর্ড এ্যাস্ট্রোজেনার কাছ থেকে কিনেছে সেটা ভারত থেকে কারা বাংলাদেশে নিয়ে আসবে। যারা নিয়ে আসবে তাদের কি এখানে কমিশন আছে? আমরা এই কথাটা বার বার বলছি যে, ভ্যাকসিন সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিতরণ অত্যন্ত প্রফেশনাল, টেকনিক্যাল ও বিশেষ ব্যাপার। আমরা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারছি ৬শ’ কোটি টাকা সিরাম ইনস্টিটিউটের কাছে দিচ্ছে সরকার। সেটার পর তারা ৬ মাসে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন পাবে। তাতে করে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিমাসে ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন আসবে। এটা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। ভ্যাকসিন পর্যবেক্ষণে বিএনপি একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করেছে জানিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ কমিটি অবিলম্বে ভ্যাকসিন সংগ্রহ থেকে শুরু করে তা প্রদান পর্যন্ত যাবতীয় তথ্যা সংগ্রহ করবে এবং সেই তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে জাতির সামনে তুলে ধরবে।

বিএনপির অপর এক সংবাদ সম্মেলনে দলের মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ভ্যাকসিন নিয়ে সরকার টালবাহানা করছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, করোনা প্রতিরোধের ভ্যাকসিন নিয়ে আওয়ামী লীগের মাস্টার প্ল্যান জনগণের কাছে পানির মতো পরিষ্কার। এ নিয়ে সরকারের লোকেরাই একেকজন একেক রকম কথা বলছেন। আর তা শুনে জনগণের কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে যে এটা একটা টালবাহানা। ভ্যাকসিন নিয়ে আওয়ামী লীগ মিথ্যাচার করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে বিএনপির সমালোচনার জবাবে সম্প্রতি সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ভ্যাকসিন নিয়ে বিএনপি অপরাজনীতি করছে। দেশের জন্য কল্যাণকর প্রতিটি কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই এখন বিএনপির স্বভাবে পরিণত হয়েছে। দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুতে বিএনপি ব্যাপক অপপ্রচার চালিয়েছিল, এখন ভ্যাকসিন নিয়েও অপপ্রচার চালাচ্ছে।

ওবায়দুল কাদের বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার এত দ্রুতগতিতে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে বলেই বিএনপির আজ গাত্রদাহ। কারণ, সরকারের জননন্দিত কাজের প্রশংসা বিএনপির অভিধানে নেই। সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে করোনা পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনার মতো ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও তা প্রদানের ক্ষেত্রেও সফল হবে। এ নিয়ে কারো আশঙ্কার কোন কারণ নেই। ওবায়দুল কাদেরের মতো আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদসহ দলের অন্য নেতারাও প্রতিদিনই ভ্যাকসিন নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের সমালোচনার সমুচিত জবাব দিচ্ছেন এবং তাদের অপপ্রচারে বিশ্বাস না করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।

করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে সরকারের উদ্দেশে ৮ দফা সুপারিশ ব্যক্ত করেছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্র্টি। সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের দেয়া ৮ দফা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে দেশে করোনা টিকা নিয়ে মুনাফাকেন্দ্রিক যে কোন প্রকার ব্যবসা ও মধ্যস্বত্বভোগী রাখার ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করতে হবে। করোনার ভ্যাকসিনকে জনপণ্য বিবেচনা করে বিনা পয়সায় সরকারী ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেক নাগরিকের ভ্যাকসিন পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। ভ্যাকসিন আমদানিতে বিকল্প উৎসের অনুসন্ধান এবং ভ্যাকসিন প্রদানে রাজনৈতিকসহ যেকোন ধরনের পক্ষপাতিত্ব পরিহার করতে হবে। করোনা ভ্যাকসিন আমদানি, ব্যবস্থাপনা, প্রয়োগসহ গোটা পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সম্পন্ন করতে হবে। ভ্যাকসিন আমদানিতে জরুরীভিত্তিতে বিকল্প উৎসসমূহ বের করতে হবে।

করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও জনসম্মুখে তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে। সম্প্রতি দলীয় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের বলেন, করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে যেন কোন মহল বাণিজ্য করতে না পারে সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। যে ৩ কোটি ভ্যাকসিন পাওয়ার কথা তা কি তিন কোটি মানুষ পাবেন নাকি দেড় কোটি মানুষ, তা পরিষ্কার নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।