বৈশাখের রুদ্ররূপ, দীর্ঘ দগ্ধ দিন দারুণ দাহনবেলা

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :২৭ এপ্রিল ২০২১, ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ
বৈশাখের রুদ্ররূপ, দীর্ঘ দগ্ধ দিন দারুণ দাহনবেলা

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রতি দুই মাস অন্তর রূপ বদলায় প্রকৃতি। এই কিছুদিন আগেও শীত জেঁকে বসেছিল। আর এখনের কথা ভাবুন, পুরোই উল্টো! শীতের শী-ও নেই কোথাও। একটা গরমাগরম অবস্থা চলছে। ক্লান্তশ্রান্ত মানুষ। জনজীবন একরকম অতিষ্ঠ। কারণ আর কিছু নয়, গ্রীষ্ম তার স্বরূপে ফিরেছে।

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ দুই মাস গ্রীষ্মের কাল। এ সময় সাধারণত তাপপ্রবাহ অনেক বেড়ে যায়। যারপরনাই রুক্ষ-শুষ্ক হয়ে ওঠে প্রকৃতি। বৃষ্টির তেমন দেখা মেলে না। অনেক নদী নাব্য হারায়। পুকুর-খাল-বিলের পানি শুকিয়ে যেতে থাকে। রসহীন শুকনো মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। জলের তৃষ্ণা নিয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে পাকপাখালি। এ সময় ভাল কিছুই ঘটে নাÑ এমন নয়। তবে অসহনীয় গরমে নাস্তানাবুদ হতেই হয়। কবিগুরুর ভাষায় : দারুণ অগ্নিবাণে রে হৃদয় তৃষায় হানে রে/রজনী নিদ্রাহীন, দীর্ঘ দগ্ধ দিন/আরাম নাহি যে জানে রে…।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এখন সেই দীর্ঘ দগ্ধ দিন। গরমাগরম অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছিল গ্রীষ্ম। ক্রমে তাপমাত্রা বেড়েছে। আর মাসের মাঝামাঝি এসে দেখা যাচ্ছে বৈশাখের রুদ্ররূপ। রবিবার তো গত সাত বছরের রেকর্ডই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। ওই দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত। যশোরে রেকর্ড হওয়া এই তাপমাত্রা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই দিন রাজধানীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এর আগে ২০১৪ সালের একই দিনে যশোরেই দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৪২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। চুয়াডাঙ্গায়ও তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে উঠেছিল। ঢাকায় উঠেছিল ৪০ ডিগ্রীতে। পরে আর দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রী সেলসিয়াস অতিক্রম করে যায়নি। রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৫-এর নিচে ছিল। কিন্তু এখন গোটা দেশেই তাপমাত্রা বাড়তির দিকে।

আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলছেন, বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ এলাকার ওপর দিয়ে তীব্র ও মাঝারি দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে। এ কারণে সোমবারও বেশিরভাগ এলাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসের ওপর ছিল।

এরই মাঝে গত রবিবার থেকে অনেকটাই শিথিল করে দেয়া হয়েছে লকডাউন। রাজধানীর সব দোকানপাট খোলা। সঙ্গে সঙ্গে খুলেছে আরও অনেক কিছু। বহু মানুষ কাজে ফিরতে শুরু করেছে। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও, সড়কে যান চলাচল অনেক বেড়েছে। দেখা দিচ্ছে যানজটও। এসব পরিস্থিতি গরমের অনুভূতিটাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটেখাওয়া মানুষ। রিক্সাচালকদের দেখে সেটি সহজে অনুমান করা যায়। গরমে রিক্সায় বসে থাকাই যখন দায় তখন তারা যাত্রী পরিবহন করছে। সবই যে পেটের দায়ে তা বুঝতে বাকি থাকে না।

সোমবার দুপুরে কাকরাইলে বড় রাস্তার ধারে রিক্সা থামিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মুক্তার মিয়া নামের এক চালক। পুরো শরীর তার ঘামে ভেজা। গামছা দিয়ে সে ঘাম মুছতে মুছতে বলছিলেন, গত কয়েকদিনের লকডাউনে কড়াকড়ি ছিল খুব। রিক্সা নিয়ে বের হলেই পুলিশ ধরেছে। আয়-রোজগার কিছু করতে পারেননি। এখন যখন কিছুটা ছাড় দেয়া হয়েছে তখন গরমে টেকা দায়। কিন্তু জীবন তো চালাতে হবে। তাই রিক্সা নিয়ে বের হয়েছেন। একটু ‘রেস্ট’ নিয়ে নিয়ে যাত্রী তুলছেন বলে জানান তিনি।

কাজে ফেরা অন্য মানুষরাও গরমে হাঁসফাস করছে। রাজধানীর রাস্তায় হঠাৎ কোন গাছ পাওয়া গেলে তার নিচে দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নিতে দেখা যাচ্ছে অনেককে। গরমে শরীর প্রচ- ঘামছে। ঘন ঘন পানির তেষ্টা পাচ্ছে। রাস্তার ধারে তাই বিভিন্ন জাতের শরবত সাজিয়ে রেখেছেন দোকানিরা। শরবতের গ্লাসে বেশি করে বরফকুচি দেয়া। ‘জানটা একটু বাঁচাতে’ অনেকেই এসব গ্লাস হাতে তুলে নিচ্ছেন। তরমুজের ফালি ছোট করে কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে যারা রোজা রেখে বাইরে বের হচ্ছেন তাদের দুর্ভোগের সীমা নেই। বহু কষ্টে একেকটি দিন পার করতে হচ্ছে তাদের।

ঘরের ভেতরেও যে সবাই খুব ভাল আছেন, না, তা বলা যাবে না। ফ্যানের বাতাস পর্যন্ত গরম হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর ছোট ফ্ল্যাটে সীমিত দরজা-জানালা। ভেতরের অনেক মানুষ তাই সেদ্ধ হচ্ছে শুধু।

এদিকে, আগামীকাল মঙ্গলবার দেশের বেশিরভাগ এলাকার তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। তারা বলছেন, দাবদাহ বিস্তৃত হতে পারে নতুন নতুন এলাকায়ও। তাই বলে এ পরিবর্তনকে খুব একটা অস্বাভাবিক বলে মানতে নারাজ তারা। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গ্রীষ্মকালে গরম কখনও বেশি হবে। কখনও একটু কম। ঋতু পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এটি হয়ে থাকে।

সুতরাং গ্রীষ্মকে অস্বীকার করা যাবে না। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে গ্রীষ্মের অবদানও যথেষ্ট। এ অবদান বাঙালী অস্বীকার করবে, সে সুযোগ কই?

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।