বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভ্যাট নয়, বিনিয়োগ করুন

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :২০ জুলাই ২০২১, ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভ্যাট নয়, বিনিয়োগ করুন

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী কৈলাস সত্যার্থী ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতের সুন্দর বাংলাদেশের জন্যই শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে। শিক্ষা খাতে আজ এক ডলার ব্যয় করলে ২০ বছর পর তার ১৫ গুণ ফল (রিটার্ন) পাওয়া যায়।’

দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এ বক্তব্যকে গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু ইতিবাচকভাবে নয়, বরং উলটোভাবেই। তার ফল আমরা দেখেছিলাম ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায়। সেই বাজেট প্রস্তাবনায় বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিবর্তে উলটো তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করার কথা জানিয়েছিলেন। যা ছিল অনেকটা উচ্চশিক্ষা প্রসারের যাত্রাকে সংকুচিত করার মতো।

সেই প্রস্তাব নিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টানা অবরোধ, তুলকালাম কাণ্ডের প্রেক্ষাপটে একপর্যায়ে ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে সরকার, যা সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবী মহলে সমাদৃত হয়। কিন্তু বছর-পাঁচেক না যেতেই আবার সেই একই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলো। করোনা মহামারির এমন সংকটকালীন অবস্থায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ফের ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবনা দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি।

সাধারণত ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর কোনো পণ্যের ওপর বসানো হয়। অর্থাৎ আমরা যেটি উৎপাদন করছি না; কিন্তু ভোগ করছি, তার ওপর ভ্যাট প্রযোজ্য। কিন্তু শিক্ষা তো পণ্য নয়, বিনিয়োগ এবং অনেকটাই সামাজিক সেবা। সেখানে কেন ভ্যাট বসানো হবে? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী ট্রাস্টের অধীনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিচালিত।

আর ট্রাস্ট আইন ১৮৮২ অনুযায়ী ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হওয়া অলাভজনক প্রতিষ্ঠান করযোগ্য নয়। হয়তো অনেকেই বলতে পারেন, কোম্পানি আইন-১৯৯৪-এর আওতায় লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিচালিত বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আয়ের ওপর ভ্যাট আরোপ করা গেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট নয় কেন?

কারণ দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় ট্রাস্ট আইনে আর বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পরিচালিত হয় কোম্পানি আইনে। তবে আমরা যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর ভ্যাট আরোপ সমর্থন করি না। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি বা বেসরকারি হোক, তা প্রণোদনার দাবিদার, সেখানে কেন ভ্যাট আরোপ বা মুনাফা অর্জনের বিষয় আসবে!

আমাদের একটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত, বাংলাদেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ খুব সংকুচিত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিয়ে ৪৯টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিকেল কলেজে উচ্চশিক্ষায় ভর্তিযোগ্য আসনসংখ্যা মাত্র ৬৩ হাজার। আর এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার। এই যে বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫ ধারী এবং পাশকৃত শিক্ষার্থীদের অনেকেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ পাবে না, তারা যাবে কোথায়? তাদের বেশির ভাগেরই পছন্দের জায়গা নিঃসন্দেহে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এটাই সত্য।

একদিকে আসন সীমিত থাকার সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে টিউশন ফি দিয়ে উচ্চশিক্ষায় তাদের ভর্তি হতে হবে। সেক্ষেত্রে যদি নতুন করে ১৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভ্যাট আরোপ করা হয়, তা কতটুকু যৌক্তিক! একটু ভেবে দেখা উচিত। অর্থমন্ত্রীসহ ভ্যাট আরোপের পক্ষে যারা আছেন, তারা হয়তো অনেকেই বলবেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে এত এত টাকা আয় করছে, তাদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করলে সমস্যা কী? কিন্তু তাদের তো বুঝতে হবে শিক্ষা কোনো পণ্য নয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের উৎস একমাত্র টিউশন ফি।

তাহলে ভ্যাট আরোপ চূড়ান্তভাবে কার ওপর বর্তায়? ছাত্রছাত্রীদের ওপরই বর্তাবে। শিক্ষার্থীরা এ বিষয়টি বোঝাতে বারবার সংবাদ সম্মেলন করেছে। বারবার বলতে চেয়েছে, এ ভ্যাট আরোপ আল্টিমেটলি শিক্ষার্থীদেরই বহন করতে হবে। যেখানে করোনা সংকটের কারণে ছাত্রছাত্রীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন বিপন্নের পথে, সেখানে কেন ভ্যাট আরোপ! তারা বলছে, বর্তমানে যেখানে আমাদের দরকার বিশেষ প্রণোদনা, সেখানে ভ্যাট আরোপ ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ ছাড়া কিছুই না।

আবার অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ালেখা করে, তারা হচ্ছে সমাজের উচ্চবিত্তের অধিকারী। তারা টাকা দিয়েই পড়াশোনা করছে। তাদের ভ্যাট দিতে সমস্যা কোথায়? কিন্তু বাস্তবতা আসলেই ভিন্ন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যদি বসুন্ধরা-বারিধারার দুয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধরা হয়, তবে এর চেয়ে ভুল আর কিছু হতে পারে না।

প্রকৃত অর্থে বর্তমানে অধ্যয়নরত সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়ে। আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই এ কথা বলছি। মফস্বল থেকে আসা এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকের সন্তানরাও এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ফি পরিশোধ করার জন্য অভিভাবকরা জমিজমা বন্ধক, এমনকি বিক্রি পর্যন্ত করছে। এমতাবস্থায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ শিক্ষাব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এতে উচ্চশিক্ষা প্রসারের পরিবর্তে সংকুচিতই হবে।

যে বাস্তবতা না বললে নয়, করোনাকালে নানাভাবে অর্থ সংকটে পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় এবং ড্রপ আউট সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তারা অর্থ সংকটে পড়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। অর্থ সংকটে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা ও ভবন ভাড়া প্রদান অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

একদিকে শিক্ষার্থী না পাওয়ায় ক্ষতির মুখে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ঝরে পড়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ কারণে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের বেতন অর্ধেক করেছে, অনেকের চাকরি চলে গেছে, অনেক ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রি করে দিতে চাচ্ছে। করোনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবার কবে পুরোপুরি চালু হবে, তারও কোনো ইঙ্গিত নেই। এ অবস্থায় বাড়তি ভ্যাট আরোপ কোনোভাবেই যৌক্তিক এবং বাস্তবসম্মত নয় বলে আমরা মনে করি। ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি।

সংশ্লিষ্টদের কাছে আমাদের প্রশ্ন, সরকার যেখানে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি ও অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে, সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে, সেখানে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কেন কোনো বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না?

অথচ বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে আমরা মনে করি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট আরোপ নয়, বরং বিনিয়োগ করা উচিত। আমরা আরও মনে করি, ভ্যাট আরোপ নয় বরং বিকাশমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এবং অস্তিত্ব রক্ষায় সরকারি প্রণোদনাসহ অন্যান্য সহায়তা প্রয়োজন। এজন্য ইতোমধ্যে বাজেট পাশ হলেও সরকার চাইলে সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে বা সরকারি আদেশে যে কোনো সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরোপিত ভ্যাট বাতিল করতে পারে। সরকার এমন উদ্যোগ নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এছাড়া আমরা সার্বিকভাবে শিক্ষা খাতে সরকারের বরাদ্দ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা উচিত বলে মনে করি। কারণ মোট জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অনেক কম, যা আন্তজার্তিক সংস্থা ও সচেতন ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের মোট বরাদ্দ হিসাব থেকে প্রযুক্তি খাত বাদ দিলে চলতি অর্থবছরেও জিডিপির তুলনায় আমাদের শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ২.৫ শতাংশের বেশি হবে না। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপালেও এ বরাদ্দ সাড়ে তিন শতাংশের বেশি।

আর শিক্ষা খাতে বরাদ্দের আন্তজার্তিক মান হলো জিডিপির ৭ শতাংশ। এই আন্তজার্তিক মান বজায় রাখতে সরকারের পদক্ষেপ দরকার। রূপকল্প ২০৪১: উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে এবং ‘এসডিজি-৪’-এর মূল লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতে বাংলাদেশ সরকারের যে অঙ্গীকার, তা নিশ্চিত করতে শিক্ষা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই। এ বাস্তবতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ভ্যাট আরোপের মতো অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সরকার সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এগিয়ে যাবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মো. ফুয়াদ হোসেন সরকার : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এবং ফয়সাল আকবর : জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

আরও পড়ুন