বিহারি ক্যাম্পে ‘চুলার আগুনে’ পুড়ছে বিদ্যুৎ

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :৪ আগস্ট ২০২২, ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ
বিহারি ক্যাম্পে ‘চুলার আগুনে’ পুড়ছে বিদ্যুৎ

রাজধানীর মিরপুরে বিহারি ক্যাম্পে ঘরে ঘরে জ্বলছে হিটার (বৈদ্যুতিক চুলা)। একেকটি চুলা (হিটার) এক হাজার থেকে ১৫শ ওয়াটের। রান্নার কাজে এই চুলা ব্যবহার করেন ক্যাম্পের বাসিন্দারা। এ ছাড়া বিহারি ক্যাম্পগুলোর ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘরে আলো-বাতাসের প্রবাহ হওয়ায় রাতদিন লাইট-ফ্যান জ্বালিয়ে থাকছে মানুষ। দিনে ক্যাম্পের গলির রাস্তায়ও আলো জ্বলে। রান্নার ঘরে ঘরে জ্বলছে হিটার (বৈদ্যুতিক চুলা)। শীতকালে আরাম পেতে ওই হিটারও জ্বলে সারাক্ষণ। আর এসি, টিভি, ফ্রিজ তো অনবরত চলছেই। অল্প খরচে ভারী যন্ত্র চালানোর জন্য এখানে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় কলকারখানা।

মিরপুর ১১ নম্বরের বিহারি ক্যাম্প ঘুরে এমন চিত্রই চোখে পড়েছে। বিদ্যুৎ অপচয় রোধে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার ছিটেফোঁটাও নেই এখানে। প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। বিদ্যুৎ নিয়ে চলছে ছিনিমিনি খেলা।

জানা গেছে, মিরপুরের পল্লবীর ৩৯টি ক্যাম্পের ১৩ হাজার ৫৪৫টি বসতবাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহার হলেও বিভিন্ন মামলা জটিলতায় বিল আদায় করতে পারছে না বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি-ডেসকো সূত্রে জানা গেছে, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী এ দেশে আটকে পড়া উর্দুভাষী অবাঙালিদের (বিহারি) যাবতীয় বিদ্যুৎ খরচ বহন করার দায়িত্ব সরকারের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এই বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোর বিদ্যুৎ বিলের টাকা পরিশোধ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এরপর আর কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি। এর মধ্যে বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৭ কোটি টাকা।

পল্ল­বীর বিহারি ক্যাম্পগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ক্যাম্পের ঘরে ঘরে ব্যবহার হচ্ছে হিটার (বৈদ্যুতিক চুলা)। কয়েক হাজার পরিবার হিটারে (বৈদ্যুতিক চুলা) রান্না করছে। বেশির ভাগ হিটার ১৫০০ থেকে ২০০০ ওয়াটের। ক্যাম্পের অলিগলি ও ঘরের সিঁড়িতে দিনের বেলায় আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। অনেকে লাইট-ফ্যান জ্বালিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সাউন্ড বক্সে বিকট শব্দের গানে শব্দদূষণ হলেও সবাই তা উপভোগ করছেন। ক্যাম্পের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সুতা, জুতা, জরি, ডায়িং, বরফ, আইসক্রিম, তাঁত ও লেদ মেশিনের কারাখানা গড়ে উঠেছে ক্যাম্পজুড়ে। দেশে যে বিদ্যুৎ সংকট চলছে, এখানে এলে তা বোঝা যায় না।

জানা গেছে, ক্যাম্পের বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য টাকা দেওয়া না লাগলেও কয়েক যুগ ধরে একটি চক্র প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিলের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা ঘরপ্রতি ১ থেকে ২ হাজার টাকা ও কলকারখানার মালিকদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আদায় করছে। ক্যাম্প থেকে আবাসিক ভবন, কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দিয়ে এ চক্রটি নিজেদের পকেট ভারী করছেন।

স্থানীয়রা জানান, মিরপুর ১১ নম্বর ফুটবল গ্রাউন্ড ক্যাম্পে আজাদ, এমসিসি ক্যাম্পে সাব্বির, মিস্টার ও মেহতাব, এডিসি ক্যাম্পের আলি মোহাম্মদ, সোসাইটি ক্যাম্পে গুড্ডু, মিল্লাত ক্যাম্পে শাকিল, নন লোকাল রিলিফ ক্যাম্পে সাহানা নামের এক নারী বিদ্যুৎ বিলের নামে টাকা সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া মিরপুর ১২ নম্বরের ক্যাম্পগুলো থেকে বিদ্যুৎ বিলের নামে টাকা সংগ্রহ করেন ঢাকা জেলা প্রশাসন থেকে মনোনীত নন লোকাল রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন ভন্টু।

বাংলাদেশ বিহারি পুনর্বাসন সংসদ ২ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি পারভেজ বলেন, সরকার ক্যাম্পে ফ্রি বিদ্যুৎ দিয়েছে। এ বিদ্যুৎ দিয়ে শুধু লাইট-ফ্যান জ্বালানোর কথা থাকলেও ক্যাম্পের বিদ্যুৎ সব কিছুতেই চলে। ক্যাম্পে কয়েক হাজার হিটার (বৈদ্যুতিক চুলা) রয়েছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিলের নামে প্রতিমাসে ক্যাম্প থেকে টাকা তোলে একটি চক্র। কারখানার জন্য ৫ হাজার টাকা, চুলাপ্রতি ৫০০ টাকা, পানির মটরের জন্য ৩০০ টাকা ও লাইট ফ্যানের জন্য ২০০ টাকা আদায় করছে চক্রটি।

মিরপুর ১১ নম্বরের স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আশরাফ বলেন, ক্যাম্পে প্রতিদিন কয়েক হাজার হিটার (বৈদ্যুতিক চুলা) চলে। সারা মাসে একটি হিটারে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়, তা ৫টি পরিবারের বিদ্যুৎ খরচের সমান। তিনি বলেন, বিহারি ক্যাম্পের কারণে মিরপুরে লোডশেডিং বেড়েছে।

বিদ্যুৎ বিল তোলার অভিযোগের বিষয়ে মিরপুর ১২ নম্বরের নন লোকাল রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন ভন্টু বলেন, ক্যাম্পে বিদ্যুৎ বিলের নামে কোনো টাকা তোলা হয় না। বিদ্যুৎ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে টাকা খরচ হয় শুধু তাই তোলা হয়।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডেসকোর (সেলস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন) পল্ল­বী জোনের এক উপসহকারী প্রকৌশলী বলেন, বিহারি ক্যাম্পে মোটা দাগের বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। এটা ওপেন সিক্রেট। ক্যাম্পের বিদ্যুৎ নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। সরকার বিনা টাকায় বিদ্যুৎ দিলেও ক্যাম্পের কিছু বিহারি নেতা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে টাকা হাতাচ্ছেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পে ফ্রি বিদ্যুৎ দেওয়া বন্ধ হলে মিরপুরে লোডশেডিং অনেকাংশে কমে যাবে।

ডেসকোর (সেলস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন) পল্ল­বী জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. জিলহাজ উদ্দিন বলেন, বিহারি ক্যাম্পে ১৮টি মিটার লাগানো রয়েছে। ক্যাম্পের বিদ্যুৎ বিল সরকার বহন করে।

ক্যাম্পে বিদ্যুতের অপচয় নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ডেসকোর জনসংযোগ শাখায় যোগাযোগ করতে বলেন।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।