বিধি নিষেধের মধ্যেই টিকে থাকার লড়াই

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :২৮ এপ্রিল ২০২১, ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ
বিধি নিষেধের মধ্যেই টিকে থাকার লড়াই

জীবনের প্রয়োজনে জীবিকা। এর চেয়ে সত্য আর কি হতে পারে? অথচ আজ সেই জীবন ও জীবিকা মুখোমুখি। ঘরের বাইরে বের হলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি। মৃত্যুর আশঙ্কা। এর পরও চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। বিধিনিষেধের মধ্যেই টিকে থাকার লড়াই করছে।

এর আগে গত বছরের মার্চ মাসে দেশে প্রথমবারের মতো ধরা পড়ে করোনা। এক বছরে বহু সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চাকরি ব্যবসাসহ সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকা-। চলতি বছরের প্রথম দিকে রোগের প্রাদুর্ভাব কিছুটা কমেছিল। তখন নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছিল সাধারণ মানুষ। ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু কে জানত সত্যি সত্যি দ্বিতীবার আঘাত হানবে কোভিড-১৯? ভাইরাসটি যখন পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছিল ঠিক তখন এ আঘাতে এলোমেলো হয়ে গেছে সব কিছু। মঙ্গলবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, গত এক দিনে করোনায় দেশে আরও ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু ১১ হাজার ২২৮। গত একদিনে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরও ৩ হাজার ৩১ জন। মোট শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৫৯ জন হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই সংক্রমণ উর্ধমুখী।

এ অবস্থায় গত ১৪ এপ্রিল থেকে আবারও শুরু হয় লকডাউন। কিন্তু কতদিন আর এভাবে চলে? এক সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই জীবিকার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়। জোরদার হয় কাজে ফেরার দাবি। এর প্রেক্ষিতে লকডাউন পুরোপুরি তুলে নেয়া না হলেও, কাজে ফেরার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

ঈদ সামনে রেখে আগে থেকেই দোকানপাট খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। জোর দাবির মুখে লকডাউন শিথিল করে গত ২৫ এপ্রিল সারাদেশে দোকানপাট খুলে দেয়া হয়। দোকান মালিক সমিতির দেয়া তথ্যে দেখা যায়, দেশে প্রায় ২০ লাখ দোকানপাট রয়েছে। এসবে সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ কাজ করে। ঢাকায় দোকানপাটের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। মার্কেট শপিংমল আছে সাড়ে ছয় হাজার। সবই এখন খোলা।

দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দীনের ভাষায়, একেবারেই অপরাগ হয়ে দোকানপাট খুলতে বাধ্য হয়েছি আমরা। এত বড় বিপদে আগে কোনদিন পড়তে হয়নি। এবার ঈদের আগে দোকানপাট বন্ধ থাকলে এমনিতেই অনেকে পথে বসতেন। না খেয়ে মরতে হতো। এখনও ক্রেতার সংখ্যা কম জানিয়ে তিনি বলেন, সামনে বিক্রি ভাল হবে বলে আশা করে আছি আমরা। করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, দোকানগুলোতে সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে। না মানলে, আমরা বলেছি, কঠোর ব্যবস্থা নিতে। মূলত এভাবে জীবন ও জীবিকার মধ্যে একটা ভারসাম্য স্থাপনের চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

তারও আগে থেকে কাজের সন্ধানে নেমে গিয়েছিলেন খেটে খাওয়া মানুষ। রাজধানীতে রিক্সাচালক ভ্যানচালকদের লড়াইটা আলাদাভাবে চোখে পড়েছে। এখনও বিধি নিষেধের কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সর্বত্রই চলছে রিক্সা অটোরিক্সা। ফার্মগেট এলাকার রিক্সাচালক আউয়াল বলছিলেন, করোনায় মানুষ মারা যাওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। টেলিভিশনের খবরে দেখেছেন। বেশ ভয়ও হচ্ছিল তার নিজেকে নিয়ে। কিন্তু কয়েকদিন রিক্সা নিয়ে বের না হওয়ায় সংসার চলছিল না। ঈশ্বরদীর এক গ্রাম থেকে স্ত্রী ঘন ঘন ফোন করছিলেন। জানতে চাইছিলেন, কবে টাকা পাঠাতে পারবেন তিনি। স্ত্রী এবং বাচ্চাদের কথা ভেবে মাত্র তিন দিনের মাথায় রিক্সা নিয়ে বের হয়ে যান বলে জানান তিনি। তার এখন বলাটি এরকমÑ আমরা গরিব মানুষ। আমরার করোনা ধরবো না। আল্লাহ আছে।

অটোরিক্সা চালকরাও দিন রাত কাজ করছেন। মনি নামের এক সিএনজি অটোরিক্সা চালকের খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, তিনি নিজেই বাহনটির মালিক। করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা তিনি নিজে এটি চালান। বাকি সময় অন্য ড্রাইভার আছে, তিনি চালান। এভাবে বড় সংসারের ভরণপোষণ করে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি। বলেন, ‘মাস্ক পরতেছি প্রতিদিন। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে মাঝে মধ্যে খুলি। বাকি সময় মুখেই থাকে। হাতও সময় পাইলে সাবান দিয়া ধুইয়া নেই। এর পরও যদি কিছু হয়, তাইলে ধরেন, কপাল।’

একইভাবে বুড়িগঙ্গায় নৌকো ভাসিয়েছেন মাঝিরা। তাদের ছোট ছোট নৌকোয় এখন ভালই যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে। সাত্তার নামের এক মাঝি বলছিলেন, দোকানপাট খুলে দেয়ার পর যাত্রী বেড়েছে। প্রচুর মানুষজন তাদের নৌকোয় করে প্রতিদিন ঢাকায় ঢুকছে। এতে তিনি বেশ খুশি বলেই মনে হলো। কারণ জানতে চাইলে তার জবাব, ‘অনেকদিন তো খেয়ে না খেয়ে কোন রকমে বাঁইচ্যা আছিলাম। এখন অন্তত খায়া মরুম। খায়াই মরতে চাই!’

এদিকে, ঢাকার অলিগলিতে পথচারীর সংখ্যা কম হলেও, ফুটপাথের দোকানগুলো একেবারে খালি পড়ে নেই। বিক্রেতারা ব্যবসা জমিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে এখন অনেকেই বিক্রি করছেন ইফতারসামগ্রী। ফুটপাথে ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসছেন বিক্রেতারা। গ্রীনরোডের ফুটপাথে ইফতারি বিক্রি করেন আজিজুল। সন্ধ্যার আগে আগে এখানে বেশ ভিড় করেন ক্রেতা। এতে করোনা সংক্রমণের ভয় থেকে যায় বৈকি। এর পরও ভিড়টাই যেন আশা করেন তিনি। বলেন, ‘রোজার মাত্র এই কয়টা দিন। কিছু বিক্রি হইলে ধরেন, বাকি দিনগুলো চলতে পারমু। না হইলে তো এমনিতেই না খেয়ে মরতে হইবো।’ এ অবস্থায় করোনার সঙ্গে ‘ফাইট’ দিয়েই বাঁচতে চান বলে জানান তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।