বিদ্বেষ সত্ত্বেও বেড়ে চলেছে ভারতীয় পণ্য আমদানি: বাংলাদেশ কেন ভারতে বাজার পাচ্ছে না? – ইউ এস বাংলা নিউজ




ইউ এস বাংলা নিউজ ডেক্স
আপডেটঃ ৭ September, ২০২৬

বিদ্বেষ সত্ত্বেও বেড়ে চলেছে ভারতীয় পণ্য আমদানি: বাংলাদেশ কেন ভারতে বাজার পাচ্ছে না?

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ৭ September, ২০২৬ |
২০২৪-এর আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা-বলয়ে থাকা দলগুলো ভারতবিদ্বেষ পুঁজি করে সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি করেছে বিভাজন। যার প্রভাব পড়েছে কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরেও। তবে এত ধরনের জটিলতা সত্ত্বেও পারস্পরিক বেচাকেনায় তার বড় প্রভাব পড়েনি। পণ্য আনা-নেওয়ার ওপর উভয় পক্ষ থেকে নানান শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যার ধাক্কা পড়েছে প্রধানত সীমান্তকেন্দ্রিক স্থলবন্দরগুলোতে। এত সব প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার মাঝেই ভারত থেকে পণ্য কেনার পরিমাণ এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে, যদিও ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের বিক্রি স্থবির হয়ে একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। পরিসংখ্যান ও বাণিজ্য ব্যবধান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য দেশে ঢুকেছে,

যা এর আগের অর্থবছরে ছিল ৯.৬২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে ভারতের কাছ থেকে আমদানির বিলে অতিরিক্ত ১.৩৪ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে। এর বিপরীতে, একই অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশি পণ্য পাঠিয়ে আয় হয়েছে ১.৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা তার আগের বছরের ১.৭৬ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে সামান্য কম। এই পরিস্থিতির কারণে দুই প্রতিবেশীর বিশাল বাণিজ্য বৈষম্য অপরিবর্তিত রয়ে গেছে—বাংলাদেশ ভারতে যে পরিমাণ পণ্য পাঠায়, তার অন্তত ছয় গুণ বেশি পণ্য সে দেশটি থেকে এনে থাকে। কাঁচামালের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ভৌগোলিক সুবিধা বাংলাদেশের কারখানা পরিচালনা ও উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ভারত থেকে। সুতা, তুলা, প্রসেসড ফেব্রিক, শিল্প উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য আমদানি করতে গিয়ে

ভৌগোলিক নৈকট্যের সুবিধা পায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো; পরিবহন সময় যেমন কম লাগে, তেমনি অন্যান্য উৎসের চেয়ে খরচও সাশ্রয়ী হয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদার কারণে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের অনেক সময় ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভর করতেই হয়। ফলে রাজনৈতিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেমনই থাকুক, জরুরি কাঁচামালের এই যোগান হুট করে বন্ধ করা সম্ভব নয়। ভারতের সঙ্গে সুদীর্ঘ সীমান্ত ও অবকাঠামোগত সংযোগের কারণে অর্থনীতির এই আন্তঃনির্ভরতা তৈরি হয়েছে; তাই চীনের পরই ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহত্তম বাজার। টেক্সটাইল খাত ও আমদানির পথ পরিবর্তন ভারত থেকে সুতা আমদানির চিত্রে এই চাহিদার একটি বড় প্রমাণ মিলছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত

আজিজ রাসেলের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে সুতা কেনায় খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের ১৪ হাজার কোটি টাকার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। স্থলপথে বাধ্যবাধকতা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা সমুদ্রপথকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং সেখান থেকেই আমদানিতে এই উল্লম্ফন ঘটেছে। তার মতে, অতীতে স্থলবন্দরের অনানুষ্ঠানিক পথে আসা কিছু পণ্য এখন বৈধ সমুদ্রপথে আসায় প্রকৃত চাহিদার পরিষ্কার চিত্র বেরিয়ে এসেছে। তবে তিনি সীমান্ত দিয়ে সুতা আনা বন্ধ রাখার পক্ষে মতামত দেন, যাতে প্রতিকূল খরচের বাজারে দেশীয় টেক্সটাইল মিলগুলো টিকে থাকতে পারে। এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য সস্তায় সুতা সরবরাহ বজায় রাখা, অন্যদিকে স্থানীয় মিলগুলোকে চরম প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করা। ভারতে

রপ্তানি স্থবিরতার কারণ আমদানি ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও ভারতের সুবিশাল বাজারে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে পড়ছে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশ কেবল তৈরি পোশাকনির্ভর পণ্য পাঠাতে চায়, যেখানে ভারতে ইতিমধ্যে দেশীয় ও বৈশ্বিক উৎপাদকদের চরম প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ ভারতের বাজারে পিছিয়ে থাকার ৩টি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন: ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী উৎপাদন ব্যবস্থা থাকা, সে দেশের কঠিন মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা ও কঠোর মানদণ্ড এবং সমন্বিত আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনের অনুপস্থিতি তিনি মনে করেন, বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (CEPA) সাক্ষর করা গেলে এই শুল্ক ও অশুল্ক প্রাচীরগুলো অপসারণ করে বাণিজ্য পরিবেশকে আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য করা যাবে। পাল্টাপাল্টি সিদ্ধান্ত ও সাম্প্রতিক ঘটনাপঞ্জি ২০২৪ সালের রাজনীতির

পালাবদলের পর দুই দেশের বাণিজ্যিক নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে থাকে। ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত চিত্র: সময়কাল নেওয়া পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত মার্চ ২০২৫ স্থানীয় শিল্প রক্ষায় স্থলপথে ভারতীয় সুতা প্রবেশ বন্ধের সুপারিশ পেশ করা হয়। ৯ই এপ্রিল ২০২৫ বাংলাদেশের পণ্য ৩য় দেশে পাঠানোর ট্রানজিট সুবিধা তুলে নেয় ভারত। ১৫ই এপ্রিল ২০২৫ এনবিআর স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা প্রবেশ নিষিদ্ধ করে (সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রাখা হয়)। ১৭ই মে ২০২৫ স্থলপথে বাংলাদেশের পোশাক, পাট ও কৃষিপণ্য গ্রহণে বিধিনিষেধ জারি করে ভারত। ২৭শে জুন ২০২৫ বাংলাদেশি পাট ও টেক্সটাইলের কিছু অতিরিক্ত উপকরণের ওপরও ভারতের স্থলকেন্দ্রিক বাধা সম্প্রসারিত হয়। এত বাধা সত্ত্বেও বাণিজ্য গতি হারায়নি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের ওপর জয়ী হয়েছে দুই দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের বাস্তবতা। কূটনৈতিক সমাধান ও স্বাভাবিকীকরণের তাগিদ ব্যবসায়ী নেতারা

স্থলবন্দর দিয়ে স্বাভাবিক চলাচল ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে উচ্চতর রাজনৈতিক লেভেলে সংলাপ দরকার। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘রিপিড’-এর প্রধান এম এ রাজ্জাক ও এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক মো. ফজলুল হক মনে করেন, সীমান্ত বাণিজ্য শুধু পণ্য আদান-প্রদান নয়, বরং সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির অংশ; তাই শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছায় আলোচনার মাধ্যমে জটিলতাগুলো দূর করা জরুরি। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ১৮ই আগস্ট ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিনিধিদলের (CII) সঙ্গে বৈঠকে আশার আলো দেখা গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাণিজ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির দুই দেশের ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাধাগুলো দূর করার তাগিদ দিয়েছেন। সিআইআই প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে দুটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে; পাশাপাশি তারা তথ্যকেন্দ্র, সবুজ হাইড্রোজেন, সেমিকন্ডাক্টর ও ব্যাটারি স্টোরেজের মতো উদীয়মান খাতে যৌথ কাজের ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো বাণিজ্যকে স্রেফ ‘একমুখী কেনাকাটায়’ সীমিত না রাখা। সীমান্ত পারাপারের সাময়িক বাধা অপসারণ করাই শেষ কথা নয়; ভারতের কঠিন মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে দেশীয় পণ্যের মান বৃদ্ধি, বৈচিত্র্য আনয়ন এবং যৌথ সাপ্লাই চেইন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। পাশাপাশি কাঁচামালের সহজলভ্যতা ও দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা—এ দুটির চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। ভারত থেকে কাঁচামাল নিয়ে নিজেদের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি, পারস্পরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে তবেই দীর্ঘদিনের এই বাণিজ্য ঘাটতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


শীর্ষ সংবাদ:
বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড-এনসিটি চুক্তির অর্থ কী? চিঠির আবেগ থেকে ডিজিটাল বার্তা: আজ বিশ্ব ডাক দিবস ভারতে ক্যানসার ওষুধের দাম কমতে পারে ৭০ শতাংশ ইরানে ফের মার্কিন হামলার শঙ্কায় বেড়েছে তেলের দাম লোডশেডিং আড়াই হাজার মেগাওয়াট, জ্বালানি সংকটে বন্ধ ৩৫ বিদ্যুৎকেন্দ্র জলপরী দেখতে চলল পুজো-অর্চনা, জালে মিলল সিলভার কার্প মাছ এলপিজি কারসাজির শেষ কোথায় নতুন আলোচনা রিকনসিলিয়েশন অক্টোবরে দিনে আক্রান্ত ২০৯৯, মৃত্যু ৭ জন ১০ উড়োজাহাজ কিনতে এয়ারবাসের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশের চুক্তি সই বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় সতর্ক পুলিশ জ্বালানি তেলের প্রভাবে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি আসন্ন নির্বাচনে যেসব কারণে হেরে যেতে পারেন নেতানিয়াহু সংকটে রাশিয়া, কপাল খুলছে ইরানের মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ ২৭০০ বিড়াল চুরি করে মাংস বিক্রি! মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি, সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের মুখে শ্রীলংকান যুবক মহাকাশে বড় বিপদ থেকে যেভাবে রক্ষা পেল বাংলাদেশের স্যাটেলাইট তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সেচ্ছাসেবক দলের নেতা বগাকে ধরতে অভিযানে বাধা ডা. শাহাদাতের বিআইডিএস-এর প্রতিবেদন: বিদেশি অনুদানে টান পড়ায় ধুঁকছে ছোট ও মাঝারি এনজিও