বন্যায় ১৫ হাজার খামারির দুঃসময়

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :২১ জুন ২০২২, ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
বন্যায় ১৫ হাজার খামারির দুঃসময়

সিলেটের কানাইঘাটের দলইমাটি গ্রামে আছে বাবুল আহমদের পশুখামার। গবাদি পশুকে খাওয়ানোর জন্য তিনি যে খড় সংগ্রহ করেছিলেন, তা মে মাসের বন্যায় তলিয়ে যায়।

এরপর লতাপাতা খাইয়ে কোনোরকমে গরু-ছাগল বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এই বন্যায় একেবারে সর্বনাশ। গবাদি পশুকে কী খাওয়াবেন, কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবেন- কিছুই বুঝতে পারছেন না বাবুল। কোরবানির হাটে গরু-ছাগলগুলো ভালো দামে বিক্রির আশায় ছিলেন তিনি। এখন লাভ তো দূরে থাক, গবাদি পশুর প্রাণ বাঁচানোই তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

জৈন্তাপুরের হেমু ভাটপাড়া গ্রামের আব্বাস উদ্দিনের ঘর পাঁচ দিন ধরে ডুবে আছে। নিজের সংসারেই খাবার সংকট। এর মধ্যেও ভাবতে হচ্ছে গবাদি পশুর কথা। কোরবানির সময় গরু-ছাগল বিক্রি করে কিছু পয়সা মেলে; যা তাঁর সারা বছরের বড় আয়।

বাবুল ও আব্বাসের ভয়াবহ বন্যায় সিলেটের সবক’টি উপজেলা কমবেশি তলিয়ে যাওয়ায় মহাবিপদে পড়েছেন পশু খামারিরা। পাঁচ দিন ধরে সারাদেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন সুনামগঞ্জ। এই অঞ্চলে অর্ধকোটি মানুষের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক গবাদি পশু এখন পানিবন্দি। গত মার্চ-এপ্রিলে সুনামগঞ্জে আগাম বন্যায় ফসলহানির পাশাপাশি গো-খাদ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপর মে মাসের মাঝামাঝি সিলেট-সুনামগঞ্জে দ্বিতীয় দফা বন্যা খামারিদের দুশ্চিন্তা বাড়ায়।

তবে এখনকার বন্যায় সিলেট অঞ্চলের খামারিরা এক রকম নিঃস্ব। কানাইঘাট পৌর শহর সংলগ্ন শ্রীপুর গ্রামের জাকারিয়া বলেন, চার মাসের ব্যবধানে তিনবার বন্যায় সব শেষ। গতকাল সোমবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি বিভাগীয় কর্মকর্তারা। সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাই গবাদি পশুর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।

সিলেট বিভাগের চার জেলায় এবার প্রায় ১৫ হাজার খামারির কাছে কোরবানি উপযোগী ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি গবাদি পশু রয়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ের এসব গবাদি পশুর সিংহভাগ পানিবন্দি থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যার পানি নামলে সব গবাদি পশুকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় গো-খাদ্য সংকট ও রোগ-ব্যাধির ফলে ঝুঁকির মুখে পড়েছেন খামারিরা। এ ছাড়া কোরবানির আগে স্বল্প সময়ের মধ্যে গবাদি পশু বিক্রি উপযোগী করার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সব মিলিয়ে কোরবানি সামনে রেখে হাজারো খামারি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছেন। বন্যার কারণে পশুর হাটেও পড়তে পারে নেতিবাচক প্রভাব।

বন্যায় সিলেটে গো-খাদ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রুস্তম আলী বলেন, পানিতে তলিয়ে খড় নষ্ট হচ্ছে। গবাদি পশুর জন্য যে ঘাস চাষ করা হয়েছিল, তাও টেকানো যায়নি। বন্যা দীর্ঘায়িত হলে টাকার অঙ্কে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বড় হবে। তিনি বলেন, বানের পানি নামলে গবাদি পশুর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি থাকবে। খাদ্যাভাবে পশুর স্বাস্থ্য নষ্ট হলে, তা পুনরুদ্ধারে সময় দরকার। এসব কোরবানি হাটে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গত মে মাসের বন্যায় সিলেটে গবাদি পশু সংশ্নিষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৩৭ হাজার ৯৩ হাজার টাকা। এবারের বন্যায় সিলেটের জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটে গবাদি পশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই দুই উপজেলায় ১১টি গরু, ৫টি মহিষ, ২১টি ছাগল, ১০টি ভেড়া, ২ হাজার ৭১৫টি মুরগি ও ৪৯১টি হাঁস মারা গেছে বলে জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া কানাইঘাটে তিনটি ভেড়া মারা গেছে। সুনামগঞ্জে গবাদি পশুর ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য দিতে পারেননি সংশ্নিষ্টরা। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি এখনও নিরূপণ হয়নি।

এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, ‘জেলায় ৩৫৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২৬ হাজার ৫২২ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি ২১ হাজার ১০২টি গবাদি পশু আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। আরও বিপুলসংখ্যক গবাদি পশু আশ্রয়কেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়নি।’

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।