‘দুইশ মণ ধানসহ ঘর পানির নিচে এখন হাত পাতছি’

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :২১ জুন ২০২২, ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ
‘দুইশ মণ ধানসহ ঘর পানির নিচে এখন হাত পাতছি’

পাঁচ দিন আগেও কোম্পানীগঞ্জের চাতালপাড় এলাকায় তাঁদের পরিচিতি ছিল গ্রামের মধ্যে মোটামুটি চলে-ফিরে খাওয়া পরিবারের গৃহস্থের বউ। বানের জল ওই পরিবারটিকে কতটা ভাগ্যহত করেছে, তা হয়তো অনেকের কল্পনারও বাইরে। ওই পরিবারের দুই সদস্য পারভীন বেগম ও কল্পনা আক্তার। সম্পর্কে তাঁরা জা। পারভীনের স্বামী আঙ্গুর মিয়া ও কল্পনার স্বামীর নাম কামাল মিয়া। কোম্পানীগঞ্জের বর্ণী এলাকায় সড়কের ওপর চারটি ছোট বাচ্চাসহ একটি মুরগি এবং কয়েকটি থালা-বাসন নিয়ে বসে ছিলেন পারভীন-কল্পনার পরিবারের সদস্যরা। বৃদ্ধ শাশুড়ি হনুফা বেগম বিলাপ করছিলেন আর বলছিলেন, ‘পানি আমারে ভিক্ষুক বানাইয়া গেছে। বড় সুহে ছিলাম। গোলায় দুইশ মণ ধানও ছিল। গ্রামের সকলকে আপদে-বিপদে সহযোগিতা করতাম। কাকে কদ্দুর সাহায্য করতাম, সবাই জানে। এ কী কপাল।

এখন নিজেরা হাত পাতছি। ওপরওয়ালা সব লইয়্যা গেছে।’

হনুফা বেগমের পাঁচ ছেলে। তার মধ্যে দু’জন এলাকায় নিজেদের ক্ষেত-খামারে কৃষি কাজ করেন। ছোট ছেলে বিল্লাল মিয়া গুলশান ডিগ্রি কলেজে এইচএসসিতে পড়ছেন। বাকি দুই ছেলে ঢাকায় চা দোকানি। খেয়ে-পরে ভালোই চলছিল হনুফার সংসার। দুই দশক আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের নাটাই ভালোভাবে ধরে রেখেছিলেন তিনি। জীবনে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু এবারের বন্যায় হনুফা সব হারিয়ে নিঃস্ব। আক্ষেপ করে বলছিলেন, পানি বাড়তে বাড়তে ঘরের চালার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। অনেক ডাকাডাকির পর একজন নৌকার মালিকের মন গলে। তাঁর নৌকায় ঘরের সবাইকে নিয়ে কোনোমতে নিরাপদে এসেছি। হাইটেক পার্কে আশ্রয় নিই। এক কাপড়ে পাঁচ দিন আছি। গোসল করলেও কী পরব, এজন্য আর গোসলের নাম নিই না। ঘরের সবার পরনে একই কাপড় পাঁচ দিন ধরে। খাবার নেই। কেউ কিছু দিলে নাতি-পুতিরা ভাগ করে খাচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালায় ওদের প্রাণও যায় যায়। উপায়ান্তর না পেয়ে দুই ছেলের বউকে আজ-কালের মধ্যে ঢাকায় পাঠাব। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করবে ওরা। এরই মধ্যে দুটি বাসায় কথা হয়েছে। আপাতত বেঁচে তো থাকতে হবে। সবার সংসারেই ৩-৪ জন করে বাচ্চাকাচ্চা।

হনুফার কলেজপড়ূয়া ছেলে বিল্লাল মিয়া বলেন, পানি বাড়তে থাকায় মা ফোনের পর ফোন করছিলেন। সামনে পরীক্ষা। তবু কলেজ শিক্ষককে বলে কোম্পানীগঞ্জের দিকে রওনা হলাম। এসে দেখি, ঘরের সবার মরার দশা। কোনোমতে নৌকা এনে তাঁদের বাঁচাই। কত স্বপ্ন ছিল। এখন যেন চোখের সামনে ঘোরতর দুঃস্বপ্ন।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।