চাল পেঁয়াজ আলুর দাম বৃদ্ধির ২৯ কারণ

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :২৭ জানুয়ারি ২০২১, ৯:৩১ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 55 বার
চাল পেঁয়াজ আলুর দাম বৃদ্ধির ২৯ কারণ

জমি ও উৎপাদন তথ্যের অসামঞ্জস্যতা, অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরকারের ব্যবস্থাপনা সমস্যা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে কম সক্ষমতাসহ ২৯টি কারণে বাজারে চাল, আলু ও পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারণ বলে জানিয়েছেন সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মজুদসহ সঠিক তথ্যের প্রচারভাব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যে বিস্তারও ওই সকল পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ। সেই সঙ্গে মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধি কাটাতে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে ২৩টি সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মাঠ পর্যায়ে গবেষণায় মূল্যবৃদ্ধির এসব কারণ উঠে আসছে। মঙ্গলবার বিএআরসি অডিটরিয়ামে জাতীয় কর্মশালায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও চাল, আলু ও পেঁয়াজ প্রতিটি পণ্যের আলাদা আলাদাভাবে কয়েকটি কারণ উঠে আসে প্রতিবেদনে। কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে গবেষণা প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন বিএআরসির গবেষণা দলের সমন্বয়ক ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম। চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ উপস্থাপন করেন কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের এসএসও আব্দুস সালাম, আলুর মূল্যবৃদ্ধির কারণ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগের অধ্যাপক শেখ আব্দুস সবুর, পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারণ উপস্থাপন করেন কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের প্রধান আব্দুর রশীদ।

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য-চাল, আলু ও পেঁয়াজ ইত্যাদির দাম বাজারে বৃদ্ধির কারণ উদ্ঘাটনের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল-বিএআরসির নেতৃত্বে একটি গবেষণা দল গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। গত ২০ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীভুক্ত প্রকল্পগুলোর সেপ্টেম্বর-২০২০ পর্যন্ত সময়ের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এ সভায় বলা হয়েছিল, মাঠ পর্যায়ের কৃষক, মিল মালিক, কোল্ড স্টোরেজ মালিক ও স্থানীয় ভোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিএআরসির নেতৃত্বে অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কৃষি অর্থনীতিবিদরা প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনা করবে এবং এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন এক মাসেই জমা দেবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক চাল, আলু ও পেঁয়াজ ইত্যাদির দাম বৃদ্ধির কারণ উদ্ঘাটনের জন্য বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে গত বছরের ১২ নবেম্বর বিএআরসি কাউন্সিল এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনটি স্টাডি টিম গঠন করা হয়। গবেষণা কাজটি মূলত ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (এফজিডি) ও কী ইনফরমেন্ট ইন্টারভিউ (কেআইআই) এর মাধ্যমে প্রাথমিক ও বিভিন্ন উৎস থেকে মাধ্যমিক তথ্য উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। ধান-চাল বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে নওগাঁ, শেরপুর, কুমিল্লা ও ঢাকা জেলা; আলুর ক্ষেত্রে মুন্সীগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর ও ঢাকা জেলা এবং পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ফরিদপুর, পাবনা, নাটোর ও ঢাকা জেলা নির্বাচন করা হয়েছে। গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর কাউন্সিলে আয়োজিত এক কর্মশালায় স্বতন্ত্র তিনটি খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপিত হয়। কর্মশালার সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন সম্পন্ন করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো। প্রায় বিশ লাখ টাকা ব্যয়ে এই গবেষণা পরিচালিত হলেও নতুনত্ব কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা। আর মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে যা উঠে এসেছে সবই পুরনো এবং ইতোমধ্যেই গণমাধ্যমে বার বার এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি।

চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ৪টি এবং ধানের বাজার মূল্যবৃদ্ধির ৭টি মোট ১১ কারণ বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- প্রায় সকল কৃষকই ধান কর্তনের প্রথম মাসের মধ্যে বাজারজাতযোগ্য উদ্বৃত্তের একটা বড় অংশ বিক্রি করে দেন। গত বোরো মৌসুমে ধান বিক্রির ধরনটি পরিবর্তিত হয়েছে। এ মৌসুমে কৃষকরা তাদের ধান মজুদ থেকে ধীরে ধীরে বিক্রি করেছেন। সরকার কর্তৃক কম চাল সংগ্রহ ও যথাসময়ে আমদানির ব্যর্থতা এবং প্রয়োজনীয় বাজার হস্তক্ষেপের অভাব মূল্যবৃদ্ধির কারণ ছিল। ধানের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ- বড় মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের আধিপত্য ও অসম প্রতিযোগিতা, আমন মৌসুমে ধান উৎপাদনে ঘাটতির আশঙ্কা, ধান চাষের ব্যয় ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান মৌসুমি ব্যবসায়ী বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন হ্রাস।

ধান চালের মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধি কাটাতে ৭টি সুপারিশমালায় বলা হয়েছে- ১. ধান/চাল সংগ্রহ পদ্ধতি আধুনিকায়ন করা। কৃষকের নিকট সরাসরি ধান সংগ্রহ করা এবং মিলারদের মাধ্যমে তা চালে পরিণত করা। ২. চিকন ও মোটা দানা চালের জন্য সরকারের পৃথক ন্যূনতম সহায়তা মূল্য ঘোষণা করা। ৩. ন্যূনতম ২৫ লাখ টন চাল সংগ্রহ করা এবং মোট উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ সংগ্রহ করার সক্ষমতা অর্জন করা যাতে করে সরকার বাজারে কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে। ৪. বাফার স্টক হিসেবে সরকার প্রতি মাসে কমপক্ষে ১২.৫০ লাখ টন চাল মজুদ নিশ্চিত করা। ৫. উৎপাদন ব্যয়ের ওপর কমপক্ষে ২০ শতাংশ মুনাফা বিবেচনা করে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা। ৬. আরও বেশি ধান উৎপাদনের ইনপুট সহায়তা কর্মসূচী গ্রহণ করা এবং প্রয়োজনে নগদ সহায়তা প্রদান করা। ৭. চাল উৎপাদনের ব্যয় কমানোর কৌশল, নিবিড় বাজার নিরীক্ষণ, ধান প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো সরকারের হস্তক্ষেপ বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য সহায়ক বলা হয় সুপারিশে।

আলুর মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ১২টি কারণ চিহ্নিত করেছে। এরমধ্যে- ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধির আশায় কৃষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে আলুর মজুদ ও হিমাগার থেকে আলুর কম সরবরাহ। হিমাগারে মজুদকৃত আলুর পুনঃপুনঃ হস্তান্তর, পাশের কয়েকটি দেশে আলু রফতানি, মৌসুমি ব্যবসায়ী কর্তৃক আলুর বিপুল মজুদ ও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি, আলুর বাজারে সরকারের সীমিত নিয়ন্ত্রণ ও বাজারের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তথ্যের অভাব। অসাধু ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন মিডিয়া আলুর উৎপাদন সরবরাহ ও দাম নিয়ে গুজব ছড়ানো, অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে বাজার নিয়ন্ত্রণ, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অনুপস্থিতিও দাম বৃদ্ধির কারণ। এছাড়াও গত কয়েক বছরের তুলনায় আলুর তুলনামূলক উৎপাদন কম, বর্ষার মৌসুমের ব্যাপ্তি দীর্ঘতর হওয়ায় সবজির উৎপাদন হ্রাস ও আলুর চাহিদা বৃদ্ধি, হিমাগারে আলুর সংরক্ষণের পরিমাণ কম এবং টিসিবি কর্তৃক আলুর বিতরণ অপ্রতুল বলে দাম বেড়েছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ৬টি কারণ উঠে আসে।

অনুষ্ঠানে বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ারের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে কৃষিসচিব মোঃ মেসবাহুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।