খাদ্যে ভেজাল চলবে না ॥ কঠোর হাতে দমনের নির্দেশ

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
খাদ্যে ভেজাল চলবে না ॥ কঠোর হাতে দমনের নির্দেশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি যারা এ কাজ করছেন তাদের কঠোর হাতে দমনের নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, যারা ব্যবসা করতে চায় বা ব্যবসা করছে দুই পয়সা বেশি কামাই করার জন্য তারা এই ভেজাল দিতে থাকে বা পচা-গন্ধযুক্ত বাসি খাবার আবার ব্যবহার করে। পয়সা যেটা খরচ হচ্ছে সেটা নিয়েন, লাভের অংশও ওভাবে হিসাব করেন। কিন্তু এভাবে নিজের লাভের জন্য ভেজাল দিয়ে মানুষের ক্ষতি আর করবেন না। তা হলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

বৃহস্পতিবার ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস-২০২১’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এমন কঠোর নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে খাদ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ সম্পর্কিত মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন। খাদ্যে ভেজাল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এ ব্যাপারেও একদিকে যেমন সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। অন্যদিকে কঠোর হাতে তা দমনও করতে হবে। দুদিকেই ব্যবস্থা নেয়াটা একান্তভাবে দরকার। সে ব্যবস্থা আপনাদের নিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা কারও কাছে হাত পেতে চলতে চাই না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, নিজেদের খাদ্য নিজেদের উৎপাদন করতে হবে। নিজেদের পুষ্টি নিজেদের নিশ্চিত করতে হবে এবং সেটা আমরা নিজেরাই করব।

জাতির পিতাকে হত্যার পর যারা অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিল তারা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ চায়নি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, অবৈধভাবে সরকার গঠনের পর যারা ক্ষমতায় ছিলেন তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের কিছু লোক যেন খাদ্য আমদানি করে নিজেরা ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু আমি এটা স্পষ্ট বলতে চাই, আওয়ামী লীগ সরকার ব্যবস্থা করতে আসেনি। জনগণের সেবা করতে এসেছে, সেবক হিসেবে এসেছে। কাজেই নিজেদের আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে আমরা গড়ে তুলতে চাই। কারও কাছে হাত পেতে আমরা চলতে চাই না। সেজন্য যেহেতু জাতির পিতা বলেছিলেন- ‘আমাদের মাটি আছে, মানুষ আছে’। সেই মাটি ও মানুষকে সম্বল করেই কিন্তু আমরা দেশের উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী এ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মোছাম্মাৎ নাজমানারা খানুম স্বাগত বক্তৃব্য রাখেন। গণভবন প্রান্তে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালসহ পিএমও এবং গণভবনের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মুজিববর্ষ উপলক্ষে খাদ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের রচনা এবং কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে বিজয়ীদের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকারের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, আমি ধন্যবাদ জানাব, ইতোমধ্যে আপনারা ঢাকা শহরে বিভিন্ন হোটেল এবং রেস্তরাঁয় গ্রেডিং স্টিকার দিয়ে দিচ্ছেন এবং মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নিচ্ছেন। এটা অত্যন্ত ভাল কাজ। এ কাজটা শুধু রাজধানীতে করলে হবে না। এটা সারাদেশেই করা দরকার। সেদিকে আপনারা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারেন। এ ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানোর জন্য আপনারা যে পদক্ষেপই নেবেন, এ বিষয়ে যা সহযোগিতা করা দরকার তা করব। এজন্য অর্থের প্রয়োজন হলে অর্থমন্ত্রী ব্যবস্থা করবেন।

তিনি বলেন, আমি যা বলে যাচ্ছি অর্থমন্ত্রীকে সঙ্গে রেখেই বলে যাচ্ছি। অর্থমন্ত্রীও এখানে আছেন। আমি মনে করি যে, মানুষের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য যা প্রয়োজন সেটা আমরা করতে পারব। যদিও আমি জানি করোনার কারণে আমাদের যথেষ্ট সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে, কিন্তু তারপরও আমরা এই ব্যবস্থাটা নেব।

বিএনপি সরকার আমলে দেশকে ঘাটতির দেশে পরিণত করার ইতিহাস তুলে ধরে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে পাঁচ বছর পর ২০০১ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় ২৬ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য গুদামে রেখে যায়। কিন্তু আবার ৮ বছর পর যখন সরকারে আসি তখন ২৪ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য ঘাটতি ছিল। তিনি বলেন, এটা হচ্ছে একটি দল বা ব্যক্তিবিশেষ, যারা যখন ক্ষমতায় থাকে তাদের নীতির প্রশ্ন। আমাদের নীতিটা হচ্ছে, সব সময় আমরা দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা অনুযায়ী নিজেরা উৎপাদন করব। সেই সঙ্গে পুষ্টি নিশ্চিত করার দিকেও আমরা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী দেশের জনগণের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সুষম খাদ্য গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, সুষম খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা একান্তভাবে জরুরী ও প্রয়োজন। এটা নিরাপদ খাদ্যের মধ্যেও পড়বে বলে আমি বিশ্বাস করি। জনগণ বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও গর্ভবতী নারীরা পুষ্টির জন্য কিভাবে এই সুষম খাবার গ্রহণ করবে সে বিষয়ে তাদের সচেতন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণেও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি।

সরকারপ্রধান বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে একটি অনুরোধ করব- নিরাপদ খাদ্যের জন্য কেবল ল্যাবরেটরি টেস্ট করলেই হবে না। সেই সঙ্গে আরেকটি কাজ করতে হবে- সুষম খাদ্য কিভাবে গ্রহণ করতে হবে তা প্রচার করতে হবে। খাদ্যটা কিভাবে নিলে সেটা সুষম হবে, সেটা যেমন মাথায় রাখতে হবে তেমনি প্রচারেরও ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত দেশের মানুষের পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা না থাকায় নুন-মরিচ দিয়ে পেট ভরে চারটে ভাত খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করলেও এখন কিছুটা আমিষও ক্রয় করতে পারছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা আরও যাতে বাড়ে, তাদের যেন আর্থিক সচ্ছলতা আসে সেজন্যই তার সরকার নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তিনি এ সময় খাদ্যে ভেজাল দেয়ার কঠোর সমালোচনা করে এ বিষয়েও জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আইন প্রয়োগে কঠোর হওয়ার জন্যও সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষকে নির্দেশ দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে এক শ’টি খাদ্যশিল্পে ‘সেফ ফুড প্ল্যান’ যে নেয়া হচ্ছে এটি সারাদেশেই বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন এবং একেবারে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত এটা নিয়ে যেতে হবে। আর দেশে কেন্দ্রীয়ভাবে ফুড টেস্টিং ল্যাব প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা বিভাগীয় পর্যায়েও করতে হবে।

খাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে যেন পুষ্টির নিশ্চয়তা থাকে, সেজন্য তার সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, অতিদরিদ্র জনগণের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচী ও ভিজিডি কর্মসূচীর আওতায় দেশের ২২০টি উপজেলায় ৬ ধরনের অণুপুষ্টি সমৃদ্ধ ‘পুষ্টিচাল’ বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১০০টি উপজেলায় পুষ্টি চাল বিতরণ করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এ কর্মসূচী সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া হেলদি মার্কেট, হোটেল, রেস্টুরেন্ট গ্রেডিং করে গ্রীন জোন প্রতিষ্ঠা, নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করাসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যা যা করা প্রয়োজন তার সবকিছুই করা হবে।

সরকারের ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ প্রণয়নের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভেজাল ও দূষণমুক্ত নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতকরণে পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৯ রহিত করে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রণয়ন করেছি। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য আইনের অধীনে ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে ইতোমধ্যে ৩টি বিধিমালা, ৭টি প্রবিধিমালা প্রণয়ন করে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে।

হোটেলগুলোতে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে তার সরকারের গ্রেডিং স্টিকার প্রদানের তথ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলাতেও তার সরকারের পদক্ষেপের উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী করোনার কারণে মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্ন থাকার প্রবণতা সৃষ্টি হওয়ায় এটিকে বিশেষ ইতিবাচক দিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে সেই সচেতনতাটা এসেছে এবং মানুষ এখন নিজেরাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করে।

প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে করোনাকালীন নিয়মিত ফেস মাস্ক ব্যবহার এবং ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করার বিষয়টিও সকলকে স্মরণ করিয়ে দেন। মুজিববর্ষ উদযাপনকালে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে এসে প্রধানমন্ত্রী দেশের সকল গৃহহীন-ভূমিহীনকে অন্তত একটি ঘর নির্মাণ করে হলেও ঠিকানা গড়ে দেয়ার এবং প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বালাবার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন, বাংলাদেশে একটি মানুষও আর গৃহহীন থাকবে না। সকল ঘরেই আমরা আলো জ্বালাব।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে দেশব্যাপী চলমান বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীতে সকলকে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী উৎপাদন বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমি প্রত্যেককে অনুরোধ করব- যার যেটুকু জমি আছে তা চাষের আওতায় আনেন। এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। আমরা কারও কাছে হাত পেতে চলতে চাই না। আমাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে, নিজেদের খাবার নিজেদের উৎপাদন করতে হবে। নিজেদের পুষ্টি নিজেদের নিশ্চিত করতে হবে এবং সেটা আমরা নিজেরাই করব।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।