করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলার প্রস্তুতি রয়েছে

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :৪ নভেম্বর ২০২০, ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 24 বার
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলার প্রস্তুতি রয়েছে

বিশ্বের অনেক দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। নতুন করে ঘোষণা করা হয়েছে লকডাউনসহ বিভিন্ন নির্দেশনা। ওঠানামার মধ্যেও গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশে করোনায় শনাক্তের হার বেড়েছে। রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা ছাড়া করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় দৃশ্যমান কর্মসূচী নেই। দেশে বিরাজ করছে করোনাময় স্বাভাবিক অবস্থা। স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিভিন্ন জরিপ এবং দৈনিক রোগী শনাক্তের হার দেখিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ এখনও করোনার প্রবল থাবা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। বাংলাদেশের করোনার প্রথম ঢেউয়ের স্থায়িত্ব বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় দীর্ঘায়িত। এর মধ্যে উঁকি দিচ্ছে দ্বিতীয় ঢেউ। দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে করোনায় আক্রান্ত, মৃত্যু ও শনাক্তের হার ওঠানামা করলেও এখনও করোনার প্রবল ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে করোনা রোগী ব্যবস্থাপনায় যে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তা যথেষ্ট। তবে রোগী অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ নাসিমা সুলতানা জানান, সারাদেশে করোনা রোগীদের জন্য সাধারণ শয্যা সংখ্যা ১১ হাজার ৬০৮টি, সাধারণ শয্যায় ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২৩৬০ এবং খালি রয়েছে ৯২৪৮ শয্যা। দেশে মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে ৫৬৪, ভর্তিকৃত রোগী ২৬৪ এবং খালি রয়েছে ৩০০ আইসিইউ শয্যা। দেশে মোট অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে ১৩ হাজার ৯৫, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে ৫৭৪ এবং অক্সিজেন কনসেনট্রেটর রয়েছে ৩৬৩টি।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের লাগামহীন সংক্রমণে ফের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে দেশে দেশে। বিশ্বের অনেক দেশে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ। অনেক জায়গায় আবার কড়া লকডাউন শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনার তিন রোগী শনাক্ত হয়। তারপর থেকে শনাক্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছিল। আমাদের দেশে একদিনে চার হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। সেই প্রবণতা এখন কমে গেছে। এ সংখ্যা এখন হয়ত ১,২০০ থেকে ১,৬০০-এর মধ্যে থাকছে। পরিসংখ্যানের হিসেব নিকেষ ওঠানামা করলেও দৈনিক করোনা রোগী শনাক্তের হারের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়ে গেছে। আমাদের প্রথম ঢেউয়ের পর্যায় এখনও শেষ হয়নি। এই মুহূর্তে খুব সাবধানে না থাকলে শীতের সময় বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

শীতে সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতে শ্বাসতন্ত্রের রোগের প্রকোপ বেশি থাকে। সে সময় এমনিতেই বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক লোকদের নিউমোনিয়া, ঠা-া, জ্বর-কাশি বেশি হয়। গত বছরও শীতজনিত রোগে বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। নিউমোনিয়ার মতো রোগ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এসব রোগ হলে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। এ অবস্থায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হলে জটিলতা বেড়ে যায়। শীতে মানুষ ঘরেও বেশি থাকে। আর বদ্ধ জায়গায় ভাইরাস ছড়ায়ও বেশি। এই পরিস্থিতিতে করোনা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। আরেকটি শঙ্কার কারণও দেখতে পাচ্ছি। এখন ঠা-া-কাশি-জ্বর হলেই অনেকে সন্দেহ করছেন তিনি কোভিডে আক্রান্ত। এসব ঘটনায় অনেককে চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছে না। রোগীর করোনার টেস্ট রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এ কারণেই দেরি হয়ে যাচ্ছে। শীত মৌসুমে যেন করোনার কারণে স্বাভাবিক চিকিৎসা অবহেলিত না হয়, এ নিয়ে খুব সতর্ক থাকা দরকার। এর জন্য টেস্টিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শিশু বা বয়স্ক লোকদের যে চিকিৎসা আমরা গতবছর বা তার আগের বছর দিয়েছি, এবার যেন সেটাও দিতে পারি। আর করোনা শনাক্তের নিরিখে দেখতে পাচ্ছি, গত কিছুদিন আমরা একই জায়গায় থমকে আছি। স্বাস্থ্যবিধি মানছি না। মানুষজনের মধ্যে বেশ শিথিল মনোভাব দেখা যাচ্ছে। তাই সচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনা আবার বাড়তে পারে বলে গত ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করে জানিয়েছেন, এখনও করোনাভাইরাসের প্রভাব আছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে আরেকবার হয়ত প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। কারণ ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আবার নতুন করে তা দেখা দিচ্ছে। এ আশঙ্কা সামনে রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসহ ২২টি মন্ত্রণালয়কে আগাম প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

দ্বিতীয় ঢেউ এলে তা মোকাবেলায় সরকার পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে জানিয়ে রবিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, করোনায় দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় আগে সব প্রস্তুতি ধরে রেখে কাজ করা হচ্ছে। ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো যেভাবে করোনার জন্য কাজ করেছে তা অব্যাহত রাখা হবে। চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ চলমান থাকবে। পিপিই দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে তা ভবিষ্যতেও মজুদ থাকবে। এর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোকে প্রচার বৃদ্ধি করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কোভিড এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতেও অবগত করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই সরকারী সেবা নিতে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলকও করা হয়েছে যাকে ইংরেজীতে তুলে ধরা হয়েছে ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস।’ খুব দ্রুতই করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচার চালানো হবে বলে জানা স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডাঃ নজরুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষা বাড়লে রোগী আরও বাড়বে এটা শুরু থেকেই বলেছি। মাঝে মানুষ পরীক্ষা করাতে আসেনি। গত সপ্তাহে টেস্ট বেড়েছে। রোগীও বেড়েছে। টেস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে। শীতে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, শীতে করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়বে বলে আগেই আমরা আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলাম। উত্তরবঙ্গে বেশ ঠা-া পড়েছে। শীতের সময় নিউমোনিয়া, ঠা-া, কাশি, জ্বর এগুলো হয়। এবার যোগ হয়েছে করোনা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভার নিজেদেরই নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা অধ্যাপক ডাঃ মুস্তাক হোসেন। তিনি বলেন, জীবন জীবিকার প্রয়োজনে বিধি নিষেধসমূহ শিথিল করেছে সরকার। করোনা সম্পর্কে দেশের মানুষের মধ্যে ধারণা জন্মেছে। করোনা প্রতিরোধের বিষয়সমূহও অজানা থাকার কথা নয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টি নিজেদেরই নিতে হবে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক এম এ আজিজ জনকণ্ঠকে বলেন, করোনায় মোকাবেলায় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে সরকার। বিশ্ব ও দেশের করোনা পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেও পরিবর্তন ঘটে চলেছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও করোনার ঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারেনি বাংলাদেশ। তাই সরকারী নির্দেশনাসমূহ পালনের মাধ্যমে করোনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারেন দেশের মানুষ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, নতুন তথ্যে দেখা যাচ্ছে কেউই করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে মুক্ত নয়। ফলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ছাড়া কোন উপায় নেই।

দেশের করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অনেকটা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। নিজেদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিজেদেরই করে নিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবন জীবিকার প্রয়োজনে বিধি নিষেধসমূহ শিথিল করেছে সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া কোথাও কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর নেই। স্বাস্থ্যবিধি পালনসহ কিছু নির্দেশনা পালনের বিষয়টি বলবৎ রয়েছে। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠে নেই কোন কর্তৃপক্ষ। ফলে করোনা পূর্বকালীন স্বাভাবিক সময়ের মতো চলাফেরা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছেন সাধারণ মানুষ। তাদের স্বাভাবিক চলাফেরায় মনে হবে করোনার দিন শেষ হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারাদেশ করোনায় ছেয়ে গেছে। দৈনিক মৃত্যুহার কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও ধীরে ধীরে করোনায় মোট মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে রেকর্ড সংখ্যক করোনা রোগীর মৃত্যু ঘটার পর তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই করোনায় জর্জরিত বিশ্বের অনেক দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। বাংলাদেশে ঘটছে ব্যতিক্রম চিত্র। এদেশে করোনার তা-ব চলছে প্রায় সাত মাস ধরে। সাত মাসের প্রায় চার মাস ধরে দেশের করোনায় দৈনিক আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পৌঁছার পর প্রায় কাছাকাছি স্থানেই ওঠানামা করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সীমিত নমুনা পরীক্ষার কারণে দেশের করোনার সার্বিক চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমান অবস্থা থেকে হঠাৎ করেই দেশের করোনা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।