আনুশকার বয়স বাড়ানো দিহানের কমানোর অভিযোগ

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১১ জানুয়ারি ২০২১, ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 36 বার
আনুশকার বয়স বাড়ানো দিহানের কমানোর অভিযোগ

ধর্ষণের পর হত্যার শিকার মাস্টারমাইন্ড স্কুলের শিক্ষার্থী আনুশকার বয়স বাড়ানো ও তার ঘাতক দিহানের বয়স কমানোর অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যাওয়া আনুশকার পরিবার ও স্কুলের সহপাঠীরা গত দুদিন ধরেই এ অভিযোগ করছে। তাদের দাবি- কলাবাগান থানার পুলিশ যে সুরত হাল রিপোর্ট তৈরি করে-তাতে আনুশকার বয়স দেখানো হয়েছে ১৯। অন্যদিকে তার ধর্ষক ও ঘাতক দিহানের বয়স কমিয়ে তার সমকক্ষ দেখানো হয়েছে। এটা উদ্দেশ্যমূলক বলে জানিয়েছেন মাস্টারমাইন্ড স্কুলের শিক্ষার্থীরা। আনুশকার বাবা আল আমীনের অভিযোগ-ঘটনার শুরু থেকেই আসামিরা বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে। গত তিনদিনেও পুলিশের কাছ থেকে দিহানের জবানবন্দী পাওয়া যায়নি।

এদিকে তোলপাড় সৃষ্টিকারী এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার, নারী সংগঠনসহ তার পরিবার। রবিবার মাস্টারমাইন্ড স্কুলের শিক্ষার্থীরা আবারও প্রতিবাদ সভা করেছে। তাদের দৃষ্টিতে এটা পরিকল্পিত ঘটনা। এখন দিহানকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে। তার প্রকৃত বয়স ২১। তাকে পুলিশ ১৯ বছরের বলে আদালতে পাঠানোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বয়স সম্পর্কে আনুশকার বাবা বলেন, আমার মেয়ের বয়স কিভাবে ১৯ হলো। আমরা বুঝলাম না। আমরা তো শুরু থেকেই বয়স ১৭ বলে আসছি। কিন্তু কে বা কারা ১৯ দিল বুঝতে পারছি না। বিপদে পড়ে আমরা পাসপোর্ট, বার্থ সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরেছি। পুলিশও যথেষ্ট আন্তরিক ছিল। তারা ভাল কথাবার্তা বলছেন আমাদের সঙ্গে। সাহায্য করেছেন। তবে কোনও একটা জায়গায় তারা এই ভুলটা করেছেন। যার জন্য এটা নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। ভুল তথ্য দিয়ে মেয়েটাকে প্রাপ্ত বয়স্ক বানানোর চেষ্টা চলছে। দুঃখের বিষয় এখন পর্যন্ত দিহানের পরিবার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। দিহানের বড় ভাইও নাকি তার ভাবিকে মেরে ফেলেছিল। আমার মেয়ের সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে, আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। তাদের শাস্তি চাই।

এ বিষয়ে হাসান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, আনুশকার মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ সুরতহাল রিপোর্টে তার বয়স ১৯ বলে উল্লেখ করে। অথচ তার মা তার বার্থ সার্টিফিকেট ও পাসপোর্ট নিয়ে প্রমাণ দিয়ে প্রকৃত বয়স ১৭ বলে চ্যালেঞ্জ করেছেন। একজন কন্যা হারা মাকে কেন এভাবে কাগজপত্র নিয়ে হাসপাতাল ও থানা পুলিশে দৌঁড়াতে হবে। আবার দিহানের বয়স ২১ হলেও তা কমিয়ে দেখানো হয়েছে ১৯। অর্থাৎ বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে আনুশকা ম্যাচিউরড ও আর দিহান টিনএজার। শিশু নির্যাতন আইনে এ ঘটনার বিচার ও শাস্তি না হয় সেই টার্গেট নিয়েই পুলিশ কাজ করছে। এটা কিছুতেই মানা যাবে না। এ ঘটনার প্রতিটি বিষয় স্বচ্ছতার সঙ্গে করতে হবে যাতে দেশবাসী বুঝতে পারে জানতে পারে দিহান যে প্রকৃত ধর্ষক ও ঘাতক। তার উপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত।

এছাড়া দিহানের পক্ষে অদৃশ্য কোনও শক্তি কাজ করছে বলে দাবি করেছেন আনুশকার বাবা আল আমিন। তিনি বলেন, সবকিছু দেখে আমাদের মনে হচ্ছে মামলার শুরু থেকেই তারা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। কেননা প্রথমে হাসপাতালে কালক্ষেপণ করা হয়। থানা থেকে মামলার কাগজ ঢাকা মেডিক্যালে রাতে বা সকালে না পৌঁছানো। দেরিতে ময়নাতদন্ত করে সেটার প্রতিবেদনেও অসঙ্গতি। তাছাড়া কারাগারে গিয়েই ঘুরে বেড়ানো। এসব পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে আমাদের মনে হচ্ছে-আসামিরা বিশেষ কোনও সুবিধা পাচ্ছে। মামলা নিয়ে পুলিশের এসির সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। ছেলেটা কী স্বীকারোক্তি দিলো আমরা জানতে চাই। অথচ পুলিশ গত তিনদিনেও জবানবন্দী দেয়নি।

এ বিষয়ে গতকাল নিজ বাসায় সাংবাদিকদের আল-আমিন আহম্মেদ জানান, দিহান আনুশকার অপরিচিত ছিল না। তবে তাদের জানাশোনা পরিবার পর্যন্ত গড়ায়নি। বন্ধু মহলের কয়েকজন শুধু জানত। তিনি বলেন, আমার মেয়ের স্কুলের বান্ধবীর এক বড় ভাই আছে। দিহানসহ ওই তিন ছেলে তার বন্ধু। ওখান থেকেই আমার মেয়ের সঙ্গে দিহানের পরিচয় বা চেনাজানা। সেদিনের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঠিক ১২টা ১৯ মিনিটে আমার মেয়ের নম্বর থেকে কল আসে। আমি মিটিংয়ে থাকায় ফোনটা কেটে দেই। তারপর আর ফোন করেনি। তার কিছু সময় পর আমার স্ত্রীর ফোনে কল আসে। ফোন করে আমার মেয়ের অসুস্থতার কথা জানায়। প্রথম ফোনটা না ধরাটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় ভুল। আমার মনে হয় আমার মেয়েকে যখন জোর জবরদস্তি করা হচ্ছিল তখনই সে আমকে ফোন করেছিল। আমি যদি ফোনটা ধরতে পারতাম বিষয়টা এতদূর গড়াত না। পরে আমাকে না পেয়ে আমার স্ত্রীকে ফোন করা হয়। তবে সেটা হাসপাতাল থেকে না ওই বাসা থেকে এটা আমরা জানি না। হাসপাতালে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা আমাকে বলেন, মারা যাওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। আমার মনে হয়, এমনও হতে পারে ও কোচিং এ যাচ্ছিল। তখন ওই ছেলেরা রাস্তায় তাকে বাধা দেয়। তখন আমাকে আমার মেয়ে ফোন করে। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় এজাহার লেখার সময় খুব তাড়াহুড়া করা হচ্ছিল। কেননা আমাদের হাসপাতালে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। তখন আমি পুলিশকে বলেছিলাম- আমি ৪ জনকে আসামি করতে চাই। কেননা ছেলেটা যখন আমার স্ত্রীকে ফোন দেয় তখন সে বলেছিল, আমরা বাসায় চারজন আছি। আবার হাসপাতালেও দেখি চারজন। কিন্তু পুলিশ বলল, মেডিক্যাল রিপোর্ট আসার আগে পর্যন্ত তাদের নাম না দেই। পরে যদি তাদের তিনজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তাদের নাম যোগ করা হবে। আমিও মনে করলাম মিথ্যা বলে একটা দুইটা ছেলের জীবন এভাবে নষ্ট করতে চাই না। কারণ আমি জানি একটা সন্তান মানুষ করতে কত পরিশ্রম লাগে। কিন্তু এখন সবকিছু দেখলাম। মেডিক্যাল রিপোর্ট শুনলাম। আমার বাচ্চাকে প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়েছে। এ নির্যাতন আসলে একজনের পক্ষে করা সম্ভব না। এখন আমাদের মনে হচ্ছে, এ ঘটনার সঙ্গে চারজনই জড়িত থাকতে পারে। আমি আসলে বুঝতে পারিনি মেডিক্যাল রিপোর্ট কবে আসবে। ক’দিন লাগবে। তখনই তাদের নাম দেয়া উচিত ছিল। পুলিশ কেন তাদের এত দ্রুত ছেড়েদিল।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে দিহান পরিবারের কাছ থেকে কোন সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া না গেলেও তারা এ ঘটনায় লজ্জিত ও বিস্মিত। তার মা সানজিদা সরকার বলেন, বিচারে যদি প্রমাণ হয় দিহান অপরাধী, যা শাস্তি হবে মেনে নেব। কেননা দেশে আইন আছে, মেডিক্যালের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আছে। যদি দিহান দোষ করে থাকে তার বিচার হোক। সে যদি অপরাধী হয় তার ফাঁসি হোক, সেটা আমরাও চাই। আমরা ধরেই নিয়েছি সে অপরাধী, তাই আসামিপক্ষ থেকে কোনও আইনজীবীও রাখিনি। আমরা আসলে লজ্জিত- কারণ আমরা এ ঘটনার কিছুই জানি না। তিনি আরও বলেন, বিচারে যদি প্রমাণ হয় দিহান আসামি, যা শাস্তি হবে- আমরা মেনে নেব। কিন্তু আপনারা আমাদের পরিবারকে এভাবে অপমান করতে পারেন না। আমার নিজের সম্পর্কেও অনেক পত্রপত্রিকা বাজে মন্তব্য করছে। এভাবে বলা ঠিক না। আমাদের সঙ্গে একটা মানুষ দেখা করতে আসেনি। আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তারাও কথা বলছেন না। কেউ দেখাও করছে না। মিডিয়া আমাদের পুরো পরিবারকে দোষ দিচ্ছে। এখানে আমাদের পরিবার কিভাবে অপরাধ করল।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর কলাবাগানের ডলফিন গলির বাসায় গ্রুপ স্টাডির কথা বলে ডেকে নিয়ে আনুশকাকে চরম অমানবিক ও অস্বাভাবিক কায়দায় ধর্ষণের দরুণ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু ঘটে। ঘাতক ও ধর্ষক দিহানকে আসামি করে কলাবাগান থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ জানায়, ধর্ষণের পর রক্তক্ষরণ হলে নির্যাতিতাকে রাজধানীর আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালে নিয়ে যান অভিযুক্ত নিজেই। হাসপাতালের চিকিৎসকরা মেয়েটির অবস্থা বেগতিক দেখে কৌশলে থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে দিহানকে আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দিহানকে গ্রেফতার দেখানো হয়। শুক্রবার আসামি দিহানকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে নেয়া হলে তিনি দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।